চল্লিশের আলোয় বাংলা কবিতাঃমাঈন উদ্দিন জাহেদ

muj.8
আপন স্বভাবে হঠাৎ যখন থমকে দাঁড়াই সবুজে সমারোহে নিজেকে ভাগ্যবান ভাবি-এদেশের নাগরিক বলে। এতো বিশালতায় যাদের অবস্থান, এতো নান্দনিকতায় যাদের ভুবনে, এতো রসময় নির্মাণ যে জনগোষ্ঠীর সৃজনময়তা, তাদের একজন হয়ে মাঝে মাঝে ভাবি- এদেশ কখন শিল্পের-সাহিত্যের দ্বিতীয় তীর্থ ভূমি হিসেবে দাঁড়াবে, প্রথমতো হয়ে আছে প্যারিস। লোকসাহিত্য ও শিল্পে এবং সমস্ত সৃজনশীল নান্দনিক নির্মাণে শিল্পীরা যে আপন বৌদ্ধিকতার স্বকীয়তা রেখে গেছে তা বিশ্বশিল্প ও সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে সম্পূর্ণ আলাদা এবং ঐশ্বর্মময়। এ ঐশ্বর্য- বিশ্বজয়ের জন্য যে নাগরিক উদ্যোগের প্রয়োজন , তা নিয়ে ভাবছেন না ভোক্তা শ্রেণী। এই ভোক্তা- মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কথা উঠলেই মনটা হু হু করে উঠে।
পুরো পৃথিবীর বেনিফিশিয়ারী গ্রুপটাই এরকম কিনা? তা জানতে ইচ্ছে করে। এই নাগরিক সুবিধাবাদীই আজ বাংলাদেশের সমস্যা, সাহিত্যের সমস্যা, দ্রোহের সমস্যা, কর্মের সমস্যা, গড়ার সমস্যা, ভাঙ্গার সমস্যা। বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাস, নাটকের ইতিহাস, গল্পের ইতিহাস উপন্যাসের ইতিহাস, প্রবন্ধের ইতিহার নির্মাণে বিভ্রান্তি ও বিতন্ডার ধূম্রজাল সৃষ্টি করেছে এ নাগরিক মধ্যবিত্ত। অথচ এ সুবিধাবাদী শ্রেণী না পেরেছে নিজেদের নাগরিক উৎকর্ষে উপস্থাপিত করতে, না পারছে গ্রামীন স্বকর্য্যে আত্মস্থ করতে। এক হীনমন্য আত্মদ্বন্দ্বে ভুগেভুগে ‘সুবিধাবাদের তৈলচিত্র’ নির্মাণ করে যাচ্ছে নিয়ত। পারছে না নাগরিক যন্ত্রণাকে আত্মস্থ করতে শিল্পের স্বমহিমায়, পারছে না বাংলার আত্মস্বভাবে শিল্পের আপন স্বভাব নির্মাণ করতে। এক জটিল সমিকরণে শুধু গোজামিলের আশ্রয়ে, বেড়ে উঠছে মধ্যবিত্ত নাগরগুলো। তাই তাদের সাহিত্য, শিল্প নাটক, উপন্যাস, গল্প- এমনকি কীট-পতঙ্গ শ্যাওলার। বাধ্য হয়ে বৈয়াকরনিক বৈধতায় তাকেও পঙ্কজ বলছি আমরা। বেনিয়াদের সৃষ্ট মধ্যবিত্ত আজ ক্ষয়ে ক্ষয়ে সমাজের বোধগুলো ভাঙছে। ক্লেদের জন্ম দিচ্ছে, প্রগতির উন্ন্যসিকতায় হারাচ্ছে মূল্যায়নের মানদন্ড। য়ূরোপের কাছে বা যৌক্তিকতা যুক্তিহীনতা না বুঝে অনুকরনের বন্যায় বুদ্ধিজীবী সেজে যাচ্ছে অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন নাগরিক সমাজের। আমি ইচ্ছে করে শিক্ষিত সমাজ শব্দটি ব্যবহার করলাম না। কারণ এ শ্রেণেিক কীভাবে শিক্ষিত বলবো? যারা শিক্ষায় নামে মুখস্থবিদ্যা জাহির করছে। বৌদ্ধিকতার ন্যূনতম চর্চা যেখানে নেই, তারা কীভাবে শিক্ষিত হয়? আমার বোধগম্য হয় না। শুধু বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাস মূল্যায়নের দিকে দৃষ্টি ফেরালে, এদের মূল্যায়নের তলানিটা বুঝা যাবে। যেখানে যুক্তি নয়, বোধ নয়, ইতিহাসের অনিবার্য প্রসঙ্গ নয়, কাজ করে শুধু রাজনৈতিক আনুগত্যের মুদ্রার সৌকর্য।
হাজার বছরের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বিভিন্ন মনিষী বিভিন্নভাবে চিহ্নিত করেছেন এর কালক্রম।এই যে কাল বিভাজন তাকে মূল্যায়ন করলে একটি বিষয় পস্ট হয়ে ওঠে- তাঁরা ইতিহাসের বাস্তবতায় সময়কে চিহ্নিত করেছেন। রাজনৈতিক সময় সীমা বা সমাজ গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রনের কাল পরিধিকে সাহিত্যের সময় নির্ধারণে যৌক্তিকভাবে উপস্থাপন করেছেন। কারণ একটি জনগোষ্ঠীর সাহিত্য সংস্কৃতি শিল্প তার সমাজব্যবস্থার পটভূমিতেই বেড়ে ওঠে। যতই নান্দনিক বা শৈল্পীর উতুঙ্গ চূড়াকে পর্শ করুক, তা কখনো সময়ের চিহ্নকে অতিক্রম করতে পারে না। তাই মহাকবি গ্যাটে সত্যি বলেছিলেন ‘রাজনীতি হচ্ছে সবচেয়ে বেশী বিবেচ্য শক্তি। রাজনৈতিক উত্থান পতন বিশেষ করে আধুনিক রাষ্ট্রে একটি জনগোষ্ঠীর ভাগ্য নির্ধারণ করে।’
৪৭’ এর দেশ বিভাগ, ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৭১’র স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত একটি দেশের জনগোষ্ঠীর ভাগ্য নির্ধারণ করেছে রাজনীতিই। তাই সাহিত্যের পালাবদল কিংবা শৈলীবদল, যাই ঘটুক তা সমাজচিত্রের অনিবার্য প্রসঙ্গকে এড়িয়ে সম্ভব নয়। প্রসঙ্গটা উত্থাপিত হলো এ জন্য- সম্প্রতি কেনো মহলকে সুকৌশলে বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাস ৫২’ পরবর্তী অর্থাৎ পঞ্চাশের দিকে মুখ্য করে তুলেছে। এটা এক ধরনের মূর্খতা কিংবা একে অতি উদ্দেশ্য প্রণোদিত প্রয়াস ছাড়া অন্য কিছু ভাবা যায় না। কারণ বাংলাদেশের সাহিত্য বিবেচনায় চলি¬শের দশক এবং সত্তরের দশক একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইল ফলক। ইতিহাস নির্মাণে এই দুই দশককে আলোচনা ছাড়া বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাস রচনা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের সমালোচনা সাহিত্যে চলি¬শের দশক উপেক্ষিত। বিশেষ করে চলি¬শের দুই প্রধান কবি ফররুখ আহমদ ও আহসান হাবীবের অনুপস্থিতি, আবুল হোসেনের নেপথ্য চারণ, সৈয়দ আলী আহসানের রাজনৈতিক কূটাজালে আটকে যাওয়াই এ দশক আলোচনার প্রাদপ্রদীপে আসতে সক্ষম হয়নি। এছাড়া,- বিশেষ করে পঞ্চাশের কবিরা চায়নি তাদের জীবিত কালে চল্লি¬শের দশক প্রাধান্য লাভ করুক। এতে নিজেদের অবস্থান ঠুনকো হয়ে যায় এবং চল্লি¬শের দশকে বাংলা কবিতায় একটি বলিষ্ঠ ধারা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর চৈতন্যকে ধারণ করে গড়ে উঠে, তার বিস্তার লাভ করুক। তাই পঞ্চাশের কবিরা তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাসের পরিচর্যা করতে গিয়ে সাহিত্যের মর্যাদাবোধ উপেক্ষ করেছেন এবং সাহিত্য চর্চায়- গদ্যের যাত্রায়- নিজেরকে প্রধান করে তুলেছেন। অগ্রজদের উত্তরাধিকারকে ধারণ করে নিজেদের বিস্তৃত করেছেন কিন্তু কৃতজ্ঞতার পরিচয় দেননি। এমনি কি তাদেও সাহিত্যিক সততার ব্যপারেও প্রশ্ন তোলা যাবে।

বাংলাদেশের কবিতা বিবেচনায় কেনো চল্লি¬শের দশক অনিবার্য প্রশ্ন তুললে, বলতেই হয় তার অর্জনের কথা। ঊনিবিংশ শতাব্দীর নবচেতনায় স্নাত হয়ে যখন কলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী সমাজ বাংলা সাহিত্যের এককেন্দ্রিক ইতিহাস সৃষ্টি করে সাহিত্য সংস্কৃতিতে সাস্প্রদায়িক উস্কানি দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন সাহিত্যের প্রবল উত্তরাধিকার মুসলিম বুদ্ধিজীবী সমাজ উদার মানবতবাদী জীবনাদর্শ ইসলামের মানবিক আহবানকে শিল্পীত উপস্থাপনের বাস্তব পদক্ষেপ হিসেবে বাংলা সাহিত্যে দ্বিতীয় রাজধানী ঢাকা কেন্দ্রীক সাহিত্য চর্চার প্রয়াশ চালান এ চল্লিশের দশকে। বৃহৎ ভাটি বাংলার জনগোষ্ঠীর জীবনচর্যা সাহিত্যের পদবাচ্য ছিলো না এর পূর্বে বাংলা সাহিত্যে আধুনিক প্রয়াশে। উচ্চবিত্ত হিন্দু সমাজের জীবনাচরণকে একমাত্র মান্য রুচি হিসেবে উপস্থাপন চলছিলো বাংলা সাহিত্যে। বাঙালি মুসলমানদের একান্ত সাংস্কৃতিক চর্যা ফুটে উঠে চল্লি¬শের শব্দ শিল্প¬ীদের হাতে এই ভাটি বাংলায়। তাই বাংলা সাহিত্যে চল্লি¬শের দশক অনিবার্য ভিন্ন মাত্রার প্রসঙ্গ। বাংলা কাব্যে চল্লি¬শের দশকে ভিন্ন যাত্রা না হলে বাংলাদেশ অঞ্চলের সাহিত্যিকদের সততার প্রশ্ন তোলা যেতো ।এবং অনিবার্যভাবে বাংলা কবিতা যাত্রা রুদ্ধ হতো। তার যথার্থ উদাহরণ আজকে পশ্চিম বাংলার কবিতার শৈল্পিক প্রসঙ্গকে টেনে আনা যায় এবং পঞ্চাশের কবি সুনীলের সাম্প্রতিক বিবেচনা ‘বাংলাদেশের কবিতা পশ্চিমবঙ্গ থেকে অনেক উন্নত’ কে প্রসঙ্গে ধার করা যায়। বাংলাদেশের কবিতা অনিবার্যভাবে চল্লি¬শেরই স্বর্ণফসল। বাংলাদেশের কবিতার বিবেচনা অনিবার্যভাবে চল্লিশ থেকে শুরু করতে হবে। বাংলাদেশের কবিতা বিবেচনায় তার প্রথম যাত্রার লক্ষণ চিহ্নিত করতে গেলে স্পস্ট হয়ে উঠে তিনটি ধারা। এক) কবি ফররুখ আহমদ সৃষ্ট প্রবল আদর্শিক ধারা- যা ইসলামের কঠোর নিষ্ঠা ঘনিষ্ট এবং বলিষ্ঠ। দুই) প্রবল শিল্পনিষ্ঠ এবং চৈতন্য ধর্মনিরপেক্ষ চেতানায় নিষ্ট বস্তুবাদী ধারা আবুল হোসেন একান্তভাবে চর্চা করে গেছেন। তিন) বাঙালি মুসলমানদের জীবন চর্চার স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফুর্ত আত্মসচেতন ধারা যা সচেতনভাবে, পষ্টভাবে কবি আহসান হাবীব চর্চা করে গেছেন।
বাংলাদেশের কবিতা আলোচনা করতে গেলে প্রাসঙ্গিকভাবে এ তিন ধারাকে বিশ্লে¬ষণ করতে হবে। বাংলাদেশের কবিতার পরবর্তী দশকগুলো এ তিন ধারারই সম্প্রসারিত ফসল, যা আশির দশক পর্যন্ত মোটামোটি বলয়পূর্ণ করেছে। কবি আহসান হাবীব (১৯১৭-১৯৮৫) বাংলা কবিতায় যর্থার্থই নিয়ে এসেছিলেন পালাবদলের হওয়া। তিরিশ সৃষ্ট কাব্য স্বভাব থেকে উড়িয়ে বাংলাদেশের কবিতায় তিনি দেশজ আবহ, শব্দ এবং অনুঙ্গেও দেশজ মাত্রা যোগ করেছেন। যা সে সময়ে স্বাভাবিকভাবে কঠিন ছিলো। তিরিশের কবিদের প্রচ- প্রতাপে বাংলা কবিতায় যখন অগ্রজ অনুজ সবাই দলবেধে গ্রীক মিথ ও যূয়োপবাহী কবিতার অনুবাদে মত্ত, আহসান হাবীবের ভিন্নযাত্রা তাঁর মনস্বী চেতনার প্রবল উত্তাপের কথাই স্মরণ করিয় দেয়।

এ সচেতনা তাঁর কাব্য গ্রন্থ ‘রাত্রিশেষ (১৯৪৭) এর নাম থেকে পস্ট হয়ে উঠে। শাসনের সমাপ্তী, কে কবি রাত্রির অভিধা দেন। আধারের সমাপ্তীর সাথে বিবেচনা করেছে শৈল্পিক নৈপূন্যে। একে একে তার কাব্য গ্রন্থ, সারা দুপুর (১৯৬৪) ছায়া হরিণ (১৯৬২), আশায় বসতি (১৯৭৪), মেঘ বলে চৈত্রে যাবো (১৯৭৬)। তার কাব্য ভাব থেকে সমকালিন চেতনা পস্ট হয়ে উঠে তার কবিতাবলীতে।চল্লি¬শের দশকে প্রকাশিত তাঁর প্রথম কাব্য গ্রন্থ ‘রাত্রি শেষ (১৯৪৭) কে বিবেচনার আনলে কবি আহসান হাবীবের আত্ম স্বভাব পস্ট হয়ে উঠে। চল্লি¬শের আহত বাঙালী মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজের হৃদয় আর্তিও সাথে কাব্যিক সমাজ সচেতনা যোগ হয়েছে বাঙালি মুসলমান সমাজের তৎকালিন আত্মদ্বন্দ্ব। ভেতর বাহিরের টানাপোড়নে ‘রাত্রিশেষে’র শৈল্পিক বিন্দুতে চিহ্নিত হয়েছে।

ভাটি বাংলার অসাধারণ লোকজ বাস্তবতা সাধারণ অথবা স্বহৃদয় উপস্থিতি অনেক সময় বিদগ্ধ পাঠককে দ্বন্দ্বে ফেলে দেয়। অথচ এ আত্মা স্বভাবে চিহ্নিত হয়ে যায় কবি আহসান হাবিবের প্রেরণা। তিরিশোত্তর বাংলা কবিতায় তিনি যে বাঙালি স্বভাব আনতে চেয়েছিলেন কবিতায় তা তাঁর শব্দ ব্যবহারের দিকে লক্ষ্য রাখলে পষ্ট হয়। কবি আহসান হাবীবের কাব্য ভাষায় শব্দ ব্যবহারের আলাদা মাত্রা চিহ্নিত হয় তার তদ্ভব শব্দ প্রাচুর্য্য।ে হঠাৎ করে বাংলা কাব্যে তদ্ভব শব্দের এ প্রয়োগের ঐতিহাসিকতা আছে। বাঙালি মুসলমানদের ভাষায় সংকটময় মুহূর্তে শুধু বিভূই পাকিস্তানীদের পক্ষ থেকে সৃষ্টি হয়নি। পশ্চিবঙ্গের আর্যকরণ চলছিল সেই ১৮০০ সাল থেকে। যার ফলশ্রুতিতে ভাষায় একটি সাংস্কৃতিক-সামজিক পরিবেশ লোপ পাচ্ছিল এ বৈদিক ষড়যন্ত্রে, বাঙালী মুসলমান ক্রমান্নয়ে এর থেকে মুক্তি চাচ্ছিল। রাজপথে লড়াই করে যা পাওয়া সম্ভব হয়েছে ৫২ সালে তার চেয়ে কঠিন লড়াই ছিলো ভাষা সংগঠনে। বাঙালি মুসলমানদের আত্মস্বভাবের প্রশ্নে এ সংকট থেকে মুক্তির বৌদ্ধিক প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন ঢাকা কেন্দ্রিক বাংলা সাহিত্যের শব্দশিল্পী আহসান হাবীব সেখানে- বাঙালি ও মুসলিম দুই পরিচয় উম্মাচন করে ছিলো তার কাব্য ভাষায় নিজের আন্তর্জাতিক উত্তরাধিকারকে অস্বীকার না করে ।

৭এপ্রিলঃবাবার ১১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শোকগাথাঃবাবা! তুমি ভাল আছো?

Alamgir Chowdhury
মাঈন উদ্দিন জাহেদ
এক.
৭এপ্রিল২০০২ সাল- সকাল ৯টা আমার জীবনের এমন এক মুহূর্ত যা কখনও ভুলার নয়।রাজনৈতিক সচেতনতার কারনে কাছ থেকে অনেক মৃর্ত্যু দেখেছি,কিছু সময় সাংবাদিকতা পেশায় থাকায় অনেক বিভৎষ লাশের ছবিও তুলেছি, আপন জনের বিদায় যে কত করুণ তা বোঝানো যাবে না।আজ আমার বাবার ১১তম মৃত্যুবার্ষিকী।
আমার বাবা-মোহাম্মাদ আলমগীর চৌধুরী-তার যৌবনের ছবি দেখলে কেউ ভাববেন না এমন শৌখিন মানুষ প্রৌঢ় না হতেই এমন অপার্থীবতায় মুগ্ধ হয়ে যাবেন।রবীঠাকুরের জীবনের সাথেই শুধু তার মিলে।আমার ভাইবোনরা বড় হলে, মায়ের কাছে বাবার যৌবনের গল্প শুনেছিলাম-বাবা তার এক ফূফাতো বোনকে খুব ভালোবাসতো।।খুউব সুশ্রী ছিলেন তিনি।বাবার সাথে তার পরিণয় হয়নি পারিবারিক জটিলতায়।ঐ ফুফু কে আমরা প্রৌঢ়াতায় যা দেখেছি- তা তুলনা রহিত।আমার দাদু- বাবার ফুফিও ছিলেন অসাধারণ সুন্দরী।আমরা ডাকতাম সুন্দর দাদী, জেন্ডারের যে ভুলহোতো তা সবায় বুঝেও সুন্দর দাদী ডাকতাম।এ নিয়ে আমি একটি কবিতা লিখেছিলাম-দু’পর্বের গল্প কিংবা পুত্র হতে চাওয়া।
দু’পর্বের গল্প কিংবা পুত্র হতে চাওয়া
সৌন্দযর্নত যৌবন অনন্তের আকাশ ছুঁয়ে যখন প্রত্যাখ্যাত,
সামাজিক বিন্যাসে খুঁজে পেয়েছিলো প্রশান্তি-
নন্দনে বিমুখ সেই বুজুর্গ পিতার সন্তান তুমি,
ঢের ছিলে ভালো এ পর্বের গল্পে ।
তবু তোমার পুত্র হতে চাওয়াঃ আহা…!
আত্মার রেহাল খুঁজে বুঝি যাপনের বোধ?
বামপাশে রেখে গুচ্ছ স্নিগ্ধ হাহাকার;
আহা পুত্র হতে চাওয়া!
জননী তোমার সুবর্ণকার- হোসনে আরা;
প্রশান্ত বাবার ডাকঃ হোসনা! হো্সনে আরা! হুকাটা পুরাওতো;
অথচ অশ্রুকে নদী করে বেদনায় করেছো অবগাহন;
হা…হা…হা… গল্পের এখনও হয়নি শেষ?
আরও আছে পাশ্বচরিত্রের নিজস্ব যাপন?
ও বুঝি জীবনের গতি মেপে তুখোড় লেনদেন?
অগেজ নিপুণ মিস্ত্রি- সৌন্দর্য আটকায় রঙ ও রেখায়;
মুগ্ধ বন্ধুরা হাই তোলে প্রবল উৎকন্ঠায়-
লালরঙা নীলরঙা স্বপ্ন মিলে না কেনো বঙ্গ চাষার গোলায়।
অগ্রজা একঃ ভালবাসে উপদেশ দিতে;
অগ্রজা দুইঃ ক্লান্ত রুগির পথ্য লিখে;
অগ্রজা তিনঃ শেয়ার সুচক কমতে দেখে আঁৎকে ওঠে।
এখন তুমি পুত্র হবে?
পুত্র হওয়া কষ্ট এখন নষ্ট গ্রহে-
পাপ-পূণ্যের শেয়ার সুচক কমছে এখন;
মুগ্ধপিতার ব্যর্থ প্রেম দুঃখ আনে।
পুত্র হওয়ার গল্পটা কী শেষ হবে না?
খেয়াঘাটের শেষ কুলিটি বিঁড়ি ফুঁকে।
কবিতাটি আশি দশকের খ্যাতিমান কবি ও সম্পাদক আধ্যাপক খন্দকার আশরাফ হোসেনের একবিংশ’৯৭ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।আমি তখন বাংলা একাডেমির তরূণ লেখক প্রকল্পে ৫ম ব্যাচে কাজ করছি।মাসান্তে যখন চট্টগ্রাম আসলাম- বাবা আমার কবিতা ছাপা হয়েছে শুনে মা থেকে চেয়ে নিয়ে পড়ে অনেক ক্ষণ হেসেছিলেন, কপট অভিমান করে বলে ছিলেন ছেলে মেয়েরা বেদ্দপ হয়ে গেছে। বাবা তোমার সারল্যের হাসি আজও আমার মনে আছে।
দাদা ভাই আব্দুল খলেক চৌধুরীও ছিলেন খুব শৌখিন মানুষ,দাদুর মুখে তার রেংগুনের বান্ধবীদের গল্প শুনতাম আর হাসতাম।ধর্ণাঢ্য ব্যবসায়ী-রেংগুনে তার একটি ভাল্ব ইন্ডেস্ট্রি ছিল-জাহানারা ইলেক্ট্রনিস।ও নামের একটি পোস্টকার্ড ও আমাদের পারিবারিক ফাইলে সংরক্ষিত আছে।বাবা এগুলি আমাদের দেখাতেন আর তাঁর বাবার ঐশ্বর্য বোঝাতেন।আমি বাবাকে খোঁচা দিয়ে বলতাম- যার বর্তমান নেই সেই অতীতেত গৌরব নিয়ে অহংকার করে।বুঝতাম না বাবা, আমার এ খোঁচা দেওয়া তোমারকে কত কষ্ট দিতো।তোমার চোখ ছল ছল করে ওঠতো।বাবা আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো।
দাদু, রেংগুন কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট ছিলেন।বাবার চাচ্চুরা ,আমাদের কাছে পেলে তাদের ভাইয়ের শুধু গল্প বলতেন।কিন্তু রেংগুনে বর্মী-বাঙালী দাংগা বাধে, দাদুকে তার সমস্ত বিষয়-সম্পদ ফেলে প্রাণ নিয়ে পালাতে হয়।চট্টগ্রামে ফিরে এসে তিনি আবার মনোযোগ দিয়ে ছিলেন হোটেল ব্যবসায়।লালদিঘীর পশ্চিম পাড়ে আবাসিক হোটেল ইস্টার্ন হোটেল ছিল তার নতুন উদ্যোগ।কিন্তু বিধি বাম, তার কপাল সুখ দীর্ঘ হলো না, তিনি হঠাৎ কলেরায় মারা গেলেন।বাবা তখন কিশোর,দাদু’র অকাল মৃত্যুতে বড় ছেলে বাবার জীবনে নেমে আসে –দুঃসহ জীবন।যার যেখানে পাওনা ছিল তা তারা মেরে দেয়।দাদুর কর্মচারী গনিমিয়া অবশ্য গনিমিয়ায় হয়েছিলেন।রাইফেল ক্লাবের এলাকার বড় ফ্যান ইন্ডেস্ট্রির মালিক হয়েছেন,তার ছেলেরা এখন ফুলে ফ্যাফে বটগাছ,তবে গনিমিয়া শেষমেষ পাগলই হলেন।বাবা বলতেন পাপের ধন সয় না।বাবা, তোমার কথাগুলো আজও আমার কানে বাজে।
দুই.
দাদুর মত বাবাও ছিলেন কর্মবীর, বিশেষত সামাজিক জীবনে।তার একজীবনেই অনেক উত্থান-পতন অর্থনৈতিক পর্যায়ে আমরা দেখেছি।কিন্তু এমন পরম ধয্য ও ধর্মপরায়ন আমার জীবনে দেখিনি। বাবা দেখতে যেমন সুপুরুষ ছিলেন তেমনি কর্মেও ।আমাদের পাঁচ ভাই-বোনকে উচ্চশিক্ষা ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত দেখে গেছেন।তাদের আলকিত জীবন ব্লে দেয় বৃক্ষ তোমার নাম কী?ফলে পরিচয়।
প্রথম জীবনে আমরা বাবাকে দেখেভহি আতংকিত রূপে।কখনও সাহসকরে বাবার সামনে দাড়ায়নি।সমস্ত কিছুর মাঝে কেমন যেন একটি দুরত্ব ছিল।আমাদের সমস্ত আবদার মায়ের কাছে, মা বাবাকে বলতেন- বাবার মন্ত্রানালয়ে পাশ হলে পাশ।কিন্তু বাবা যে আমাদের কে কত স্নেহ করতো তা টের পেয়েছি-কর্মজীবনে এসে।কর্মজীবনে এসে শৃংখলার আর্গল খুলে যায়।কমে আসে বাবার সাথে দুরত্ব।বন্ধুদের সাথে আড্ডায় পড়ে কত দিন-দুপুররাত পর্যন্ত বায়রে কাটিয়ে বাসায় এসেছি- বাবা এ বয়সে আমার জন্য না খেয়ে বসে থাকতেন।শুধু অনুচ্চ কন্ঠে বলতেন বড় হয়েছো,হিতাহীত জ্ঞান থাকা উচিত । কিন্তু মনেই থাকতো না আদডার সময় বাবা যে আমার জন্য বসে আছে।কতই না কষ্ট দিয়েছি তোমাকে বাবা-অভুক্ত রেখে।আজ আমি খেতে বসলে বাবার কথামনে পড়ে।লোকমা তুলতে কষ্ট হয়- বাবা তুমি ভাল আছো?বাচ্চারা হাসে, তারাতো বুঝে না আমার ভেতর কি চলছে।তাদের যখন খেতে ডাকি- তখন বিরক্ত হয়, ছোট্ট মেয়ে টা বলে বিরলত করো না বাবা-আমি গল্প পড়ছি দেখছো না।অফিস থেকে যখন ফোন করি খেয়ে নেয়ার জন্য- তখন বলে- বাবা বেশী বেশী করে।
আমার জীবনে প্রতিক্ষনে বাবা ছায়ার মত হয়ে আছে।প্রতি বৃহস্পতিবার আল্লাহ তার পূণ্য আত্মাকে ছেড়ে দেন,তাঁরা সন্তান সন্ততিদের অদৃশ্য থেকে দেখেন, জানি না তা কতটুকু নির্ভর যোগ্য তথ্য-কিন্তু বৃহস্পতিবার এলে আমার সমস্ত চৈতন্য জুড়ে বাবা স্মৃতিগুলো তড়পায়।প্রতিক্ষণ মনে হয় বাবা আড়াল থেকে আমার সব কিছু দেখছেন।আমার অনুভূতি জুড়ে বাবা পরশ বুলায়।বাবা! তুমি ভাল আছো? কত দিন বাবা তোমার কবরের কাছে যাওয়া হয় না!আমি এখন নাগরিক সুবিধা ভোগ করেও গ্রাম্য, বিকালেয় এখানে শিয়াল ডাকে, নেয় কোলাহল, আছে ঈর্ষার দাউ দাউ আগুন, আছে লেলিহান সার্থের জিহ্বা।এখানে মানষ হাসে সার্থের জন্যে,কাদেঁও,বিনম্র হয় তৈল মর্দনে, ঠাট্টা হয় গদ গদ হতে।ভেতরের মানুষ টি কেমন? কেউ জানে না এখানে-অভিনয় কুশলতায় নৈপূণ্য হতে হতে।জীবন মঞ্চে সবায় কুশিলব।
বাবা! আমিতো তোমার কথা না শোনা সে অবাধ্য ছেলেটি-যে কখনও হতে পারেনি তোমার মত হতে।হেলায় কাটিয়েছি পুরোটা কৈশর। তুমি বলতে সবকিছু প্রতিযোগিতা করে জয় করে নিতে হয়।অথচ বাবা আমি কোনো বিষয়ে সিরিয়াস হতে পাড়লাম না। জীবনে সব কিছু অবহেলার অর্জন।কেন বাবা আমি সিরিয়াস হতে পারি না? কত কিছুই না আমি চেষ্টা করলাম, ক’দিন পরেই আগ্রহ উবে যায়,হায় আমার জীবন!নিরন্তন হারিয়ে হারিয়ে আমি ফুতুর হয়ে চলি…।
এভাবে ফতুর হতে হতে সবায় চলে যায়।বাবা! তোমার শেষ বিদায়ের সময়, কফিন টা মুড়ানোর আগে আমি তোমার কপালে চুমো খেয়েছিলাম।উফ! এমন শীতল, ইহ জীবনে কী আমি স্পর্শ করেছি?মৃত্যুর শীতলতা কত যে নির্মম, যে স্পর্শকরেনি সে কী বুঝবে?বাবা! তোমার শেষ বিদায়ের স্মৃতি আমাকে শুধু কাঁদায়।কর্কট রোগের এতো যন্ত্রণা তুমি কীভাবে সইতে বাবা? যন্ত্রণা বুঝিনি বাবা! কত কথায় শুনিনি তখন।ক্ষমা করো বাবা!তোমার স্মৃতিকে আকঁড়ে ধরে যাপন করি আমি তোমার প্রতিটি বাক্য আউরায় বাবা! তুমি আমার প্রেরণা,তুমিই বাতিঘর।

বাবা ! তুমি ভাল আছো? মাঈন উদ্দিন জাহেদ

৭এপ্রিল২০০২ সাল- সকাল ৯টা আমার জীবনের এমন এক মুহূর্ত যা কখনও ভুলার নয়।রাজনৈতিক সচেতনতার কারনে ্কাছ থেকে অনেক মৃর্তু দেখেছি,কিছু সময় সাংবাদিকতা পেশায় থাকায় অনেক বিভৎষ লাশের ছবিও তুলেছি, আপ্ন জনের বিদায় যে কত করুণ তা বোঝানো যাবে না।
আমার বাবা-মোহাম্মাদ আলমগীর চৌধুরী-তার যৌবনের ছবি দেখলে কেউ ভাববেন না এমন শৌখিন মানুষ প্রৌঢ় না হতেই এমন অপার্থীবতায় মুগ্ধ হয়ে যাবেন।রবীঠাকুরের জীবনের সাথেই শুধু তার মিলে।আমার ভাইবোনরা বড় হলে, মায়ের কাছে বাবার যৌবনের গল্প শুনেছিলাম-বাবা তার এক ফূফাতো বোনকে খুব ভালোবাসতো।।খুউব সুশ্রী ছিলেন তিনি।বাবার সাথে তার পরিণয় হয়নি পারিবারিক জটিলতায়।ঐ ফুফু কে আমরা প্রৌঢ়াতায় যা দেখেছি- তা তুলনা রহিত।আমার দাদু- বাবার ফুফিও ছিলেন অসাধারণ সুন্দরী।আমরা ডাকতাম সুন্দর দাদী, জেন্ডারের যে ভুলহোতো তা সবায় বুঝেও সুন্দর দাদী ডাকতাম।এ নিয়ে আমি একটি কবিতা লিখেছিলাম-দু’পর্বের গল্প কিংবা পুত্র হতে চাওয়া।
কবিতাটি আশি দশকের খ্যাতিমান কবি ও সম্পাদক আধ্যাপক খন্দকার আশরাফ হোসেনের একবিংশ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।আমি তখন বাংলা একাডেমির তরূণ লেখক প্রকল্পে ৫ম ব্যাচে কাজ করছি।মাসান্তে যখন চট্টগ্রাম আসলাম- বাবা আমার কবিতা ছাপা হূএছে শুনে মা থেকে চেয়ে নিয়ে পড়ে অনেক ক্ষণ হেসেছিলেন, কপট অভিমান করে বলে ছিলেন ছেলে মেয়েরা বেদ্দপ হয়ে গেছে। বাবা তোমার সারল্যের হাসি আজও আমার মনে আছে।
দাদা ভাই আব্দুল খলেক চৌধুরীও ছিলেন খুব শৌখিন মানুষ,দাদুর মুখে তার রেংগুনের বান্ধবীদের গল্প শুনতাম আর হাসতাম।ধর্ণাঢ্য ব্যবসায়ী-রেংগুনে তার একটি ভাল্ব ইন্ডেস্ট্রি ছিল-জাহানারা ইলেক্ট্রনিস।ও নামের একটি পোস্টকার্ড ও আমাদের পারিবারিক ফাইলে সংরক্ষিত আছে।বাবা এগুলি আমাদের দেখাতেন আর তাঁর বাবার ঐশ্বর্য বোঝাতেন।আমি বাবাকে খোঁচা দিয়ে বলতাম- যার বর্তমান নেই সেই অতীতেত গৌরব নিয়ে অহংকার করে।বুঝতাম না বাবা, আমার এ খোঁচা দেওয়া তোমারকে কত কষ্ট দিতো।তোমার চোখ ছল ছল করে ওঠতো।বাবা আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো।
দাদু, রেংগুন কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট ছিলেন।বাবার চাচ্চুরা ,আমাদের কাছে পেলে তাদের ভাইয়ের শুধু গল্প বলতেন।কিন্তুৎ রেংগুনে বর্মী-বাঙালী দাংগা বাধে,দাদুকে তার সমস্ত বিষয়-সম্পদ ফেলে প্রাণ নিয়ে পালাতে হয়।চট্টগ্রামে ফিরে এসে তিনি আবার মনোযোগ দিয়ে ছিলেন হোটেল ব্যবসায়।লালদিঘীর পশ্চিম পাড়ে আবাসিক হোটেল ইস্টার্ন হোটেল ছিল তার নতুন উদ্যোগ।কিন্তু বিধি বাম, তার কপাল সুখ দীর্ঘ হলো না, তিনি হঠাৎ কলেরায় মারা গেলেন।বাবা তখন কিশোর,দাদু’র অকাল মৃত্যুতে বড় ছেলে বাবার জীবনে নেমে আসে –দুঃসহ জীবন।যার যেখানে পাওনা ছিল তা তারা মেরে দেয়।দাদুর কর্মচারী গনিমিয়া অবশ্য গনিমিয়ায় হয়েছিলেন।রাইফেল ক্লাবের এলাকার বড় ফ্যান ইন্ডেস্ট্রির মালিক হয়েছেন,তার ছেলেরা এখন ফুলে ফ্যাফে বটগাছ,তবে গনিমিয়া শেষমেষ পাগলই হলেন।বাবা বলতেন পাপের ধন সয় না।বাবা, তোমার কথাগুলো আজও আমার কানে বাজে।

একগুচ্ছ ছড়া / মাঈন উদ্দিন জাহেদ

ছড়রা
মাঈন উদ্দিন জাহেদ

রতণে রতণ চিনে,
শুয়োর চিনে কচু
শয়তান শয়তান চিনে,
চেলা চিনে মোচু।
ভন্ড ভন্ড চিনে-
গোঁফে দেয় তা’
আলকায়দার ফায়দা নিতে
তৎপর এখন আলফায়দার ছা’।

তা ধীন, ধীন তা
মাঈন উদ্দিন জাহেদ

এসো ভাই এসো খাই
ভাগযোগ করে খাই
দেশ যাক যেখানে যাগ গা।
লুটেপুটে নেওয়া যাক
চেটেপুটে খাওয়া যাক
আমরাতো পাবো সব তাইনা ?
আমরাই না খেলে
খাওয়া দাওয়া হবে কী?
জমবে কী পাটির অফিসও?
চেটপুটে খেয়ে তাই
সার্থক হবে ভাই,
তোমাদের–আমাদের জন্ম;
এইতো আমাদের কর্ম।
এসো খাই
এসো পাই
তা ধীন,
ধীন তা।
পাছায় জন্মে গোস্ত
খাবো রোস্ট
পাবো পোস্ট
তা ধীন,
ধীন তা।
এসব না পেলে;
কী লাভ মিছিলে?
পরবে না হাততালি সভাতে।
জ্বলবে আগুন ভাই
বস্তি ও রাস্তায়,
পাবলিকের হোকগে যা তা।
তা ধীন,
ধীন তা
তা ধীন,
ধীন তা
আমরাতো খাই সরকারী
যা তা
চাই দরকারী
যা তা
তা ধীন,
ধীন তা…
তা …তা… তা…

এখন যারা মিছিলে যাবে
মাঈন উদ্দিন জাহেদ

এখন যারা মিছিলে যাবে
মহাকালের নায়ক তারা;
এখন যারা মিছিলে যাবে
মুক্তি-সূর্য আনবে তারা ।
এখন যারা স্লোগান দেবে
কালের কন্ঠ হবে তারা;
এখন যারা স্লোগান দেবে
মহাকাল গাইবে সে গান।
মহাকালের সূর্য মিছিল
আজকে হবে লক্ষপ্রানে
চাঁদবেনেরা আসো সবায়
গান গায় আজ মুক্তির গান।
ভাংগবে ব্যারিকেট আসবে মিছিল
ভাংগ আজ তোরা ভাংগরে ভাংগ।
লক্ষ স্লোগানে জানিয়ে দিতে
গণতন্ত্রের বিজয় গান।
আজকে যারা মিছিলে যাবে
মহকালের নায়ক তারা
আজকে যারা ভাংগবে ব্যারিকেট
মহাকাল নেবে তাদেরই দাম ;
ভাংগ ব্যারিকেট ভাংগরে ভাংগ।

বামরা গায় পূজির গান!
মাঈন উদ্দিন জাহেদ

কী চরম লুটেরার হাতে পড়েছে দেশ?
বামরা গায় পূজির গান!
প্রগতিশীলতা ব্রা প্রদর্শনীতে-
মননশীলতা রাজা কার তত্ত্বে।
চুলয় গেছে শ্রমজীবীর গান।
ধনতন্ত্রের তাক ধুম তাক,
আমরা এখন প্রাগ-মধ্যযুগে;
রাজা যায় রাজা আসে
গোলামরা গোলাম থাকে।
হলফ নামায় এতো সম্পদ!
হাইড হয়েছে কত গুণ আর!
সুশীলরা শীল থেকে গেল
তাদের বলা যায়- নরসুন্দর ।
পুজির আর কত পূজা হলে
সুশীলরা পূজা থামাবেন;
জনগণমন ওষ্ঠাগত
আর কতকাল চলবে এমন?

এখন সময়
মাঈন উদ্দিন জাহেদ

সময় এখন চিহ্নিত হওয়ার
কে বিপ্লবী কে খলনায়ক?
বামরা আজ ঘাম ফেলছে
উজির নাজির-বুর্জুয়ার
পা চেটে আজ চুক্তি করছে
টিফা আর গ্যাস দেয়ার।;
কে বাম কে রাম
কে বিপ্লবী কে খলনায়ক?
সময় এখন চিহ্নিত হওয়ার
কে স্বদেশী কে গোরখোদক?

৮মে/ মাঈন উদ্দিন জাহেদ

আজরাত স্মরণীয় হয়ে থাক শুধু তোমার জন্য
আজরাত স্মরণীয় হয়ে আছে শুধু তোমার জন্য
যে তোমার নামটায় পাল্টে দিলো গোলাব গোলাব বলে
যে তোমার বঙ্গঘরণা পাল্টে দিলো হাফিজের গজল বো’লে।

একগুচ্ছ কবিতা / মাঈন উদ্দিন জাহেদ

গোলাপ কথন
মাঈন উদ্দিন জাহেদ
ইদ্রিস নবীর উম্মতেরা খোদাকে নাকি গোলাপ দিতো;
অদৃশ্য থেকে আলো এসে কাঙ্খিতটা ছুঁয়ে নিতো।
গোলাপ! তোমার এমন কদর জানে কি কেউ এমন করে?
তাইতো তার নামটা আমি পাল্টে দিলাম গোলাপ বলে।
গোলাপ আমার অদৃশ্য হলো,মন ছুঁয়েছে খোদার বুঝি?
সে গোলাপের জন্য আমি দিবস-রজনী জেগে খুঁজি।
গোলাপ তুমি কোথায় আছো? আমার মাঝে,না অন্য কোথাও?
আমার মত এমন সুবাস! কেউ পেয়েছে তোমার কী কেউ?
তোমার জন্য মেঘকে আমি তুলো করেছি ঘুম বালিশের,
তোমার জন্য হাওয়ার মাঝে খাট বিছিয়েছি স্বপ্ন সাধের;
তোমার জন্য লেপ বানালাম বসন্তেরই পুবাল হাওয়ায়।
তুমি এখন মন ছুঁয়েছো, কার কাছেগো ?কোন গোপনে ?
তোমার জন্য থরো থরো, তোমার জন্য দ্বিধা কাতর;
তোমার জন্য মন উদাসী তোমার জন্য প্রগলভতা;
তোমার জন্য টলোমলো তোমায় নিয়ে স্বপ্ন বোনা
গোলাপ তুমি আমার আছো,গভীর গোপন বুকের ভেতর।

বাসনাগুলো
মাঈন উদ্দিন জাহেদ

আমাদের সুপ্ত বাসনাগুলো রাহুলকে প্রকাশ্যে চুমুর মাঝে ছড়িয়ে পড়ে
আমাদের সুপ্ত বাসনাগুলো স্বস্তিকার নগ্ন অভিনয়ের খবর খুঁজতে খুঁজতে বেড়িয়ে পড়ে
আমাদের সুপ্ত বাসনাগুলো তসলিমা নাসরিনের রমনের গল্প বলায় নিশপিশ করে
হায় বাসনা ! তুমি কী জোড়া কমলা লেবু? কামনার ছোট বোন?
তোমাকে গোপন করে দিন দিন আমরা ভব্য হয়ে উঠি!
বাসনা! তোমাকে চুমুয় চুমুয় ভড়িয়ে দেবো যদি তুমি কথা দাও-
তোমার আমার মাঝে সূক্ষ্ম পার্থক্যটুকু তুমি একটু একটু তুলে দাও,
আমার আমি হয়ে প্রকাশিত হবো তোমাদের আমির কাছে;
আমার আমিটুকু তোমার তুমিটুকু থেকে ফারাক হয়ে যাক কতটুকু ।

ভুল জোনাকি
মাঈন উদ্দিন জাহেদ

এখন আমি অন্ধকারে ভীষণ রকম আৎকেউঠি;
অন্ধকারে ভুল জোনাকির অংককষি।
অন্ধকারে হাতরে বেরাই স্মৃতির তুমি;
কে যে তুমি? কোন সে তুমি? ভুল জোনাকি!
এখন শুধু স্মৃতির খড়গ দাবরে বেড়ায়;
কিশোর-তরুণ-যৌবনেরই গল্পগাথায়;
কি আনন্দ! কি যে শোক ! কি যে ক্ষরণ!
এক এক স্মৃতি রোম্থনে স্মৃতির পীড়ণ।
ভুল জোনাকির পিছু নেয়ার জীবনশীলা-
লিখতে গেলে কাব্য গাথায় শোকের মাতম।
ভুল জোনাকি! ভুল জোনাকি! কেন এখন পিছু নেয়া?
ভুল জোনাকি! ভুল জোনাকি! মধ্যযামের সু্খ কেরো না।

জীবন নাকী অন্য রকম দৌড় পর্বে
মাঈন উদ্দিন জাহেদ

হাহ হা হা জীবন নাকী অন্য রকম দৌড় পর্বে
হাহ… হা… হা…মানুষ এখন ভীষণ ব্যস্ত মুখ লুকাতে
ভীষণ রকম অভ্যস্ত অভিনয়ে
হাহ হা হা জীবন নাকী অন্য রকম দৌড় পর্বে
ভীষণ রকম ত্রস্ততা তার দিন যাপনে।
আসল চেহারা ভীষণ রকম কুৎসীত তার
আসল রূপ ভীষণ রকম না দেখানোর
হঠাৎ যদি অনভ্যস্ত বেরিয়ে পরে
তাইতো এখন ভীষণ ব্যস্ত সং সাজতে ।
তাইতো এখন ভীষণ রকম অভিনেতা
মায়ের সাথে অভিনয় বাবার এখন
বাবার সাথে অভিনয় ছেলের ভীষণ;
ছেলের সাথে অভিনয় মেয়ের ভীষণ
প্রেম পর্বের আসল গল্প খুব অচেনা
কিন্তু ভীষণ সাজ পোশষাকে ঝলোমলো।
হাহ হা হা আমরা এখন ভীষণ রকম ব্যস্ত শুধু মুখ ঢাকতে
মুখ ঢেকে যায় আসল রূপের ভেংচি দেখে
মুখ ঢেকে যায় আসল রূপের আসল রূপে
অভিনয়ের ভীষণ ফাপর- হাপিয়ে ওঠা
অভিনয়ে ভীষণ বিজ্ঞাপিত না মানুষের
মনুষগুলো ভীষণ এখন দূর-অচেনা
মনুষগুলো ভী-ষণ এখন নামানুষই।

দু’জনের পথ দু’দিকে গিয়েছে
মাঈন উদ্দিন জাহেদ

স্বর্ণা একবার দিয়েছিল সব
আমি বার বার চেয়েছিলাম;
সময় দিয়েছে ফাঁকি
জীবন দিয়েছে তাড়া-
তোমার সাথে হলো না আমার
যাপিত জীবনে ফেরা।
দু’জনের পথ দু’দিকে গিয়েছে,
মাঝখানে সিঁথি রেখা;
কোনদিকে ভুল, ছিল বেশী-কম
সে আজ মিছিমিছি দেখা।
তুমি আর আমি ছিলাম দু’জনের
এটাই সত্য মূল।
আজি বসন্ত দিনে
স্বর্ণার যত মানে-
আমি আর তুমি স্মৃতি কাতরতা,
তুমি-আমি দু’জনে।

ঝিঁঝিঁপোকারা আমাকে চেনে
মাঈন উদ্দিন জাহেদ

রাতের ঝিঁঝিঁপোকারা আমাকে চেনে
চেনে কাঠপোকা- অনড় আলামিরার অজস্র কালো কালো অক্ষর
চেনে শজনে গাছের ছায়া -দেবদারু গাছ-ইউকিলিপ্টাস শিশির
নিরালা রাস্তার হাওয়া সুনসান বিকেল কিংবা একান্ত উইন্ডোশপিং
কত না সময় গেছে আমাদের ‘ভালোবাসি’ কথাটি বলার প্রস্তুতি নিতে।
সময় গিয়েছে চলে ,তার সাথে গিয়েছে চলে দেবদারু গাছ
বৈস্য ভাবনায় গেছে রসাতলে আমাদের ভালবাসা বাসি।
আমি বেঁচে আছি -
কিছু অলোক পাখির মুখ দেখে দেখে, মুখ দেখে দেখে
ঝিঁঝিঁরা সঙ্গে থাকে আর কেউ থাকে আর।

০৭.০৩.১৯৯৭
মাঈন উদ্দিন জাহেদ

খু-উ-ব বেশী মনে পড়ছে তোমাকে।
স্পর্শের জন্য এগিয়ে দেওয়া হাত-
কত হাজারবার উচ্চারিত হয়েছে মাইকেল এঞ্জেলোর কথা ।
দশটি আঙ্গুল,তার কম্পন- আমার বুকের মাঝে কি দারুণ ঢেউ তুলেছিল,
ছূয়ে যাওয়া একগুচ্ছ তারুণ্যের হাওয়া ফুলার রোড ধরে হাঁটতে হাঁটতে
নীলখেত-নিউমার্কেট-কত না উইন্ডো শপিং।
প্রতিটি উচ্চারিত শব্দগুলো হয়ে যাচ্ছিল কবিতা।
তুমি ছিলে লাবণ্যের প্রভা-কবিতার কল্পরূপ।
আরও কত কিছু।
কত মুহূর্ত-কত ক্ষণ- আজ শুধু রোমন্থন…আজ শুধু কবিতা।