শিল্পী এস এম সুলতান: আপন আলোয় অনন্য

 মাঈন উদ্দিন জাহেদ

‘কোন কোন মানুষ জন্মায় , জন্মের সীমানা যাদের ধরে রাখতে পারে না। অথচ তাদের সবাইকে ক্ষণজন্মাও বলা যাবে না। এ রকম অদ্ভুত প্রকৃতির শিশু অনেক জন্মগ্রহণ  করে জগতে, জন্মের বন্ধন ছিন্ন করার জন্য যাদের রয়েছে এক স্বভাবিক আকুতি।… শেখ মুহাম্মদ সুলতান সে সৌভাগ্যের বরে ভাগ্যবান, আবার সে দুর্ভাগ্যের অভিশাপে অভিশপ্ত। ’ (বাংলার চিত্র ঐতিহ্য: সুলতানের সাধনা- আহমদ ছাফা, র ব -১, পৃ: ১৭০) 

নড়াইলের মাসিমদিয়া গ্রামের দরিদ্র কৃষক ও রাজমিস্ত্রি  শেখ মেছের আলীর ছেলে  শেখ মুহাম্মদ সুলতান (১০ আগাষ্ট ১৯২৩Ñ ১০ অক্টোবর ১৯৯৪) ওরফে লাল মিয়া  শৈশবে বাল্য শিক্ষক কৃষ্ণনাথের জীয়ন কাঠির ছোঁয়ায় শিল্পকলার স্বপ্নময় জগতে প্রবেশ করে  যে আপন আলো র্নিমাণ করেছেনÑ তা বাংলাদেশের চিত্রকলার ধারাবাহিক যাত্রায় ভিন্ন ও অনন্য। বিশ্ব শিল্পকলায় যিনি প্রথম বাঙালি চিত্রি হিসেবে পাবলো পিকাসোর সাথে চিত্র প্রর্দশনীতে অংশ নিয়ে ছিলেন।  সাথে আরো ছিলেন- সালভার দালি, জন ব্লাক, পল ক্লী, জন র্মাটিন।  যা অনুষ্ঠিত হয়েছিল হ্যামস্টিড, লন্ডন, যুক্তরাজ্যে ১৯৫৬ সালে।  যদিও তার প্রিয় শিল্পী পিকাসো ছিলো না, প্রিয় ছিলেন ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পী সেজান ও ভিনসেট ভেনগগ।

image

  ১০ বছর বয়সে যখন তিনি ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র, স্কুল পরির্দশক ড. শ্যামাপ্রসাদ মুর্খাজীর পেন্সিল স্কেচ এঁকে শিল্পী হিসেবে সবার দৃষ্টি কাড়েন। জমিদার ধীরেন্দ্র নাথ রায়ের পৃষ্টপোষকতায় ও বিশিষ্ট শিল্প সমালোচক শাহেদ সোহরাওয়ারদীর  প্রত্যক্ষ প্রভাবে কলকাতা আর্ট কলেজে ছ’বছরের কোর্সে ভর্তি হয়েও যিনি তিন বছরেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ত্যাগ করেন-  তাতে পষ্ট হয়ে যায় তার  বহেমিয়ান জীবনের চারিত্র।  পায়ে হেঁটে যিনি উপমহাদেশের প্রায় ছোট বড় শহর ঘুরে বেড়িয়েছিলেন জীবনের পাঠ নিতে।
সুলতানের জবানিতে শুনুন তা :
 ১৯৫৩ তে,  র্আট কলেজ থেকে পালিয়ে আমি ঘুরতে থাকলাম। সারা ভারতের সমস্ত স্টেশনে আমি পায়ে হেঁটে হেঁটে ঘুিেছ।
আমিনুল: পায়ে হেঁটে?
সুলতান: পায়ে হেঁটে… সিমলা, মুশৌরী, শ্রীনগর, র্নথ ওয়ের্স্টান ফ্রন্ট গ্রাহাম…
           আমি তো নবাব ফরিদ খানের মেহমান ছিলাম। তিন মাস ঘুরতে ঘুরতে গিয়েছিলাম সেখানে। দাক্ষিণাত্যে গিয়েছি, মদ্য ভারতে গিয়েছি…(বাংলাদেশের চিত্রকলা ও চিত্রকর: আমিনুর রহমান, পৃ:৪১)
 হ্যা, শিল্পী এস এম সুলতানের প্রথম চিত্র প্রর্দশনী হয়েছিলো ১৯৪৬ সালে সিমলায়। ৪৭ এর ভারত –পাকিসাতান ভাগের পর তিনি চলে আসেন তৎকালিন র্পূবপাস্তিানে। আবার করাচি,  ফার্সি স্কুলে দু’বছর আর্ট টিচার। খ্যাতিমান শিল্পী চুকতাই ও শাকের আলীর  সাথে পরিচয় ও আন্তর্জাতিক যাত্রা। নিউইর্য়ক, ওয়াসিংটন, শিকাগো, বোস্টন ও লন্ডনে চিত্র প্রদর্শনী। ১৯৫৩ সালে আবার নড়াইলে  ফিরে আসা। শিশু স্বর্গ সহ  শিশুদের জন্য তার স্বপ্নময় পৃথিবী নির্মাণের  প্রচেষ্টা।  বিশাল নৌকায় ঘুরে ঘুরে শিশুদের ছবি আঁকা শেখানো এবং শিশুদের জন্য বহু প্রতিষ্ঠান গড়া। শিশুর চোখে তিনি পৃথিবী দেখতে চেয়েছিলেন। বলতেন … আমি তো বাচ্চাদের শিল্পী। এই স্বপ্নময়  জগতে কেটে যায়  তার অনেক সময়।

image

বাংলাদেশের চিত্র কলার মূলধারায় তিনি অনেক দিন প্রাসংগিক ছিলেন না। শিল্পচার্য জয়নুল অবেদীনের সাথে মানসিক দূরত্বে ৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা কেন্দ্রিক  চিত্রধারার সাথে অনালোচিত ছিলেন। ১৯৭৬ সালে, বিশেষ করে জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক ও  সাহিত্যিক আহমদ ছফা  প্রচেষ্ঠায় ঢাকার শিল্পকলা একাডেমীতে একক চিত্র প্রদর্শসীর পর  আলোচনার পাদপ্রদীপে আসেন। বিশেষ করে বিশিষ্ট চিন্তুক মহাত্মা আহমদ ছফা  তিমির থেকে বের করে আনেন সুলতানের চিত্রকলা।  লিখেন চমৎকার বর্ণাঢ্য চিত্র সমালোচনা-  বাংলার চিত্র ঐতিহ্য: সুলতানের সাধনা (১৯৮০)।
সুলতানের শিল্প সাধনা সম্পর্কে লেখক আহমদ ছফা বলেন: ”সুলতানকে বাংলার প্রকৃতিতে, বাংলার ইতিহাসে এবং বাংলার মানুষের শ্রম, ঘাম, সংঘাতের ভেতর  সৌন্দর্যকে আবিষ্কার করার জন্য পাড়ি দিতে হযেছে দুস্তর পথ, পেরিয়ে আসতে হয়েছে সাধনা ও নিরীক্ষার অনেক গুলো পর্যায়। তার ব্যাক্তি জীবন এবং শিল্পী জীবনের সমান্তরাল যে অগ্রগতি তাও কম বিস্ময়কর নয়।”(বাংলার চিত্র ঐতিহ্য: সুলতানের সাধনা- আহমদ ছাফা, র ব -১, পৃ: ১৫১)
সুলতানের ৫০ পরর্বতী চিত্রগুলো নিয়ে বিশিষ্ট চিত্র সমালোচক শরীফ আতিউজ্জামান সূচিবদ্ধ করেছেন এভাবে :  তার ক্যান্ভাস জুড়ে শুধু বাংলাদেশÑ বাংলার কৃষক সমাজ, উৎপাদনের সাথে যারা সম্পৃক্ত, জল ও মাটির সাথে যাদের সম্পর্ক নিবিড়। তাঁর বিশাল ক্যানভাস গুলো  ধারণ করে আছে  গ্রামের বিস্তৃর্ণ সবুজ ফসলো মাঠ, জমিতে মই দেয়া, লা্গংল -গরুতে গাঁতায় চাষ, ধান তোলা, ধান মারাই,  ধান ঝাড়া ,ধান ভানা, গোরায় ধান উঠানো, পাট কাটা , পাট বাচা, পাট ধোয়ার কাজে ব্যস্ত কৃষাণ-কৃষাণী, নদীর ঘাটে ¯œান রতা, জল ভরা, কাপড় ধোয়া,শাপলা তোলা, দুধ দোহানো, মাছ কাটার কাজে নিয়োজিত কৃসক রমণী, খাল বিল নদীতে মাছ শিকারে  ব্যস্ত  জেলে সম্প্রদায়, ঢাল সড়কি লাঠি দিয়ে চর দথলে উদ্যত মারমুখি কৃষক, আছে  ঋতু ভিত্তিক গ্রামীণ পরিবেশ’।( দশ পথিকৃৎ চিত্রশিল্পী,পৃ: ৮৪)
এছাড়া কিছু ব্যতিক্রম চিত্রও আছে:  বস্তীবাসি জীবন, জলোচ্ছাসের পর, বেদেনীদেও ঘওে ফেরা, গণহত্যার কিছু নিরীক্ষাধর্মী  বিমূর্ত  চিত্রকলা। হ্যা, শিল্পী এস এম সুলতান- তেল ও জল রঙেই মুলত: কাজ করলেও কিছু পেন্সিল ও কালির  স্কেচও আছে।
বাংলাদেশের চিত্রকলার মুলধারায়  শিল্পী  এস এম সুলতানের ছবিগুলো আপাত: প্রাসংগিক হয়ে আসে না;  তার ছবির মূল থিম  গ্রামীণ জনগোষ্ঠী হলেও তার ছবির ফিগারগুলো ব্যাতিক্রম। ফিগারগুলো  দানবীয় অঙ্গসৌষ্ঠবময়। তিনি রিয়েলেস্টক  ধারার শিল্পী হলেও  তার ছবির কৃৃষকেরা বাংলার আবহমান কৃষকের মতো নয়। দানিবীয় গাঠনিত অবয়বের তো নয়ই। তাহলে সুলতানের ছবির মানুষেরা কারা?- যারা বিশাল দেহী, সুঠাম পেশী, প্রচন্ড প্রতাপময়।
মুলত: শিল্পী সুলতান ইচ্ছাকৃত ভাবে বাস্তবকে ঠেলে কল্পনাকে সামনে আনতে চেয়েছেন। তার মাঝে এক ধরণের রোমান্টিক আদর্শবাদ  প্রাণিত হয়েছিলো। তাই তাকে সম্পূর্ণ ভাবে বাস্তববাদী শিল্পীও বলা যায় না। এ প্রসঙ্গে আমরা  শিল্পতাত্ত্বিক হারবার্ট  রিডের Realistic Painter সম্পর্কে  ব্যাখ্যাটি স্মৃতিতে রাখতে পারি:
The realistic mood needs no explanation; it is , in the plastic art , the effort to represent the world exactly as it is present in our senses, without omission, without falsity of any kind.(The Meaning of Art, page:160)

আমাদের শাদা চোখে মানুষের যে ফিগারগুলো দেখি, বা ইতিহাস ও সাহিত্যে  বাঙালির যে চিরন্তন ফিগারটা পাই, সে চিত্রের সাথে সুলতানের ফিগার গুলো মেলে না। উপমহাদেশের চিত্ররীতিতে নারীপুরুষের  যে আকৃতি  সুলতানের সাথে কেনো মেলে না? এটা ছবির দর্শক মাত্রই প্রশ্ন। নারী নিয়ে আমাদের চিত্রকলায় যে আদল আছে তা হলো: চিকণ ঠোঁট,খাঁড়া নাক, নীল তিল কুল, পদ্ম পাতা কিংবা মৃগ- খঞ্জনার চোখ । বক্ষ যুগল ঘট বা দাড়িম্ব ফলের মতো। কিন্তু সুলতানের ছবিতে আমরা তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত দেখি। তার নারীরা স্ফীত ও মেদ সর্বস্ব। নারীরাও বিশাল দেহী। মস্তক ও নীতম্বে কিছুটা ভারতীয় সাদৃশ্য। শাস্ত্রে¿ যেভাবে পুরুষের চিত্র অঁকা হয়েছে:
কিবা সুমেরু চুড়া – যেন শালদ্রুম
ফোঁড়া শশীমুখ পঙ্কজ নয়ন।
সুলতানের পুরুষেরা তেমন নয়।তার ছবির পুরুষেরা দেবতা নয় মূলত: মানুষ। সর্বপরী কৃষক।  দেবতার মতো রূপবান নয়। তার  ছবির এমন রোমান্টিক প্রবণতা দূর বাস্তবের আদর্শায়ন। এ সম্পর্কে শিল্পীর ভাষ্যই প্রণিধান যোগ্য:
শুধু ফোটোগ্রাফির উপস্থাপনা ছবি আঁকার উদ্দেশ্য হতে পারে না। আমার কৃষকের অতিকায়তা সব বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। সমালোচকরা বিভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে একে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস পেয়েছেন। কেউ একে বিকৃতি বলেছেন, কেউ আবার আমার এ্যানাটমি জ্ঞানের অভাব হিসেবেও দেখেছেন, কিন্তু এখানেই আমার ছবির দর্শন।  আমি রেঁনেসা মাস্টারদের অনুকরণে তাদের দেবসৌষ্ঠব এঁকেছি মানুষকে দেখাতে যে কৃষকদের এরূপ হওয়া উচিৎ। তাদের কৃষকায় হওয়ার পিছনে নিয়তি বা ভাগ্য নয়, শোষণের দীর্ঘ ইতিহাস জড়িত।  আমার ছবিতে একটি  প্রতিবাদী ‘মেসেজ’ আছে। আমার আশা, সব ষড়যন্ত্র ছিন্ন করে একদিন ওরা জয়ী হবেই। ওরা ওদের স্বাস্থ্য ফিরে পাবে।(ভিডিও সাক্ষাৎকার: বিশিষ্ট চিত্র সমালোচক শরীফ আতিউজ্জামান)
তবে বিশেষ ভাবে মনে রাখা উচিৎÑ ১৯৪৬ শিল্পী যখন বাবার মৃত্যুর পর  নড়াইলে ফিরে আসেন তখন শিল্পী খাকসার আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পরেন। কৃষক বিদ্রোহের সাথে যুক্ত হন। আন্ডার গ্রাউন্ড পার্টির সাথে যুক্ত হয়ে গভীর রাতে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে   কৃষকদের সমাজ পরিবর্তনের জন্য প্রাণিত করতে চেষ্টা চালান। হয়তো সে কারণে- কৃষকদের  জীবন পরিবর্তনের কথা, কল্পিত আদর্শ চিত্রগুলো, কাম্য গুলো তার ছবির সৌষ্ঠব্য হয়ে  উঠে আসতে থাকে বিভিন্ন ফিগারে, চিত্রে, স্কেচে।
 এস এম সুলতান পুরোপুরি ইম্প্রেশনিস্ট ধারার শিল্পী ছিলেন না, ছিলেন অনেকটা প্রকাশবাদী ধারার শিল্পী। আবেগ যেখানে মুখ্য।  যেখানে পরিপর্শিক  জগৎ ও অবস্থা কিছুটা অতিরঞ্জনে উপস্থাপিত। যা উদ্ভট নয় বরং উদ্ভাবিত। শিল্পতাত্ত্বিক  হারবার্ট রিট  প্রসঙ্গটিকে এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন:
it expresses the emotions of  artist at  any  cost  the cost being usually an exaggeration  or distortion of natural  appearances which  borders on grotesque.
আমরা এর বাস্তবতা গ্রীক ভাস্কর্যেও দেখি। গ্রীক ভাস্কর্যেও বাস্তবের সম্পূর্ণ প্রতিফলন হয় না। মিলোসের আফ্রোদিতিকে আমরা যেভাবে দেখি তা বাস্তবে দৃশ্যের মতো নয়।  চোখের ভ্রু ,মুখ, বক্ষযুগল বাস্তবের মতো নয়,পূন:নির্মিত।
 শিল্পী এস এম সুলতান মুলত: ইউরোপিয় রেঁনেসার শিল্পীদের মতো ভিশনারী। এক সময়ের সচ্চল কৃষক যখন সামন্তবাদী সমাজে এসে কৃষকায় হয়ে  গেলো, শোষিত হতে হতে সমাজের নি¤œবর্গে পৌঁছে গেলো, তাকে উদ্দীপ্ত করতে, তার হারানো স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারেই  শিল্পকে প্রোণদনাময় উদ্ভাস হিসেবে দেখেছেন তিনি। উজ্জ্বীবন, স্বপ্ন ও সম্ভাবনার আশাকে তার শিল্পে আশ্রয় দিয়েছেন, লালিত করেছেন বিশাল ক্যানভাসে। এ বিশালতায় বাংলার এ বিশাল কৃষিজীবী সমাজকে প্রতিনিধিত্ব করতে।
বিশিষ্ট শিল্প তাত্তি¦ক-সমালোচক ও কবি সৈয়দ আলী আহসান শিল্পী এস এম সুলতান  এর চিত্র নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন:
‘তার লক্ষ্য হচ্ছে  আমাদের গ্রামের সমাজ জীবনকে উপস্থিত করা। অত্যন্ত বলিষ্ঠ-দেহী কৃষককুল অথবা কৃষক রমণী, কৃষিকর্মে নিযুক্ত প্রানী, উর্বরা ভ’মি, এবং বলিষ্ঠ ধানের মঞ্জরী সব কিছু একাকার করে তিনি একটি সজিবতার উত্তরণ খুঁজেছেন। তার বক্তব্য হচ্ছে, এ সজিবতা হচ্ছে আমাদের কাম্য সুতরাং  তিনি কাম্যের প্রসাদকে আমাদের সামনে উপস্থিত করেছেন। অবশ্য এখাণে মনে রাখতে হবে বাস্তব দৃশ্য আমাদের গ্রামাঞ্চলে এ সজিবতাকে উদঘাটন করে না। বিপুল আয়তনের ক্যানভাস ব্যবহারের ক্ষেত্রে এস এম সুলতান যথেষ্ট সাহস দেখিয়েছেন। এ সমস্ত চিত্রের মধ্যে সমাজ ব্যবস্থার মূখ্য কোনো  সমালোচনা নেই, একটি কাম্য আস্থার উদ্ঘাটন আছে।’ ( বাংলাদেশের শিল্পকলা:শিল্পবোধ ও শিল্পচৈতন্য: পৃষ্ঠাÑ১৭১)
শিল্পী এস এম সুলতান  ছবির ফিগারগুলো  দানবীয় অঙ্গসৌষ্ঠ বলে কোনো কোনো শিল্প সমালোচক  তাকে নিয়ে তাচ্ছিল্য করেন-‘ সুলতান এ্যানাটমি জানে না’। তাদের কাছে ফিগারই মুখ্য, শিল্প নয়। মনে রাখা দরকার- শুধু জ্যামিতিক নিয়মে বাস্তবতার অনুকরণের ছবি আদর্শ ছবি নয়, তা হয়ে যায় ফটোগ্রাফি। শিল্পগুরু শ্রী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ’ বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী’তে  বলেছেন:
‘গনেশ মূর্তিটিতে আমাদের ঘরের ও পরের ছেলের এ্যানাটমি যেমন  করে ভাঙ্গা হয়েছে তেমন  আর কিছুতে না। হাতি ও    মানুষের সমস্তখানি রূপ ও রেখার সামঞ্জস্যের  মধ্যদিয়ে একটি নতুন এ্যান্টমি এলো, কাজেই সেটা আমাদের  চক্ষে পীড়া দিচ্ছে না, কেননা কেটা ঘটনা নয়, রচনা। ( শিল্প ও দেহতত্ত্ব-পৃ:৯৩)
১৯৯১ সালের  এক  সাক্ষাৎকারে শিল্পী এ এম সুলতান   তার নতুন ধরণের চিত্র ভাবনা, শিল্প ভাবনা সম্পর্কে বলেন:
মাছ গেছে,ধান গেছে , সুর গেছে সব হারিয়ে গেছে। সুজলা সুফলা কথাটি তো শেষ হয়ে গেলো। ¯্রােতোসিনী নদী মাতৃক কথাটাই ফুরিয়ে গেলো, কি করে জাতি বাঁচবে? আমি প্রতিবাদ করি,  আমি মুখে বললে বলবে যে দেশের শত্রু। সেজন্য কথা বলি না। আমি ঐ ছবিতে দেখায় দেখো, তুমি প্রশ্ন করো কৃষক মোটা হয়েছে কেনো?…কৃষককে আমি মাসুকুলার করেছি কেনো? কেননা ওদের নি:শেষ করে দিয়েছে। আল্লামা ইকবালের একটি সুন্দর  উর্দু কবিতা আছেÑ
ওঠো মেরি দুনিয়াকি…
গনিবোকোগাদো 
কৃষককে ভালোবাসি আমি এজন্য যে, ওরা কাজ নিয়ে থাকে। মাটির ধর্মী, মাটির সঙ্গে ওরা সম্পৃক্ত, আর ওরা আমাদের ফসল দেয়। আমাদের অন্ন জোগান দেয় । ওরা দু:খী হলে আমরা দু:খী হয়ে যাই। কৃষককে ভালো রাখতে গিয়েই তো ছবির ধারা বদলে গেলো আমার। ছবির স্টাইল বদলে গেলো। আমি আর বিদেশী কায়দায় ছবি আঁকছি না।’ (বাংলাদেশের চিত্রকলা ও চিত্রকর: আমিনুর রহমান, পৃ:৪৩)

শিল্পী এস এম সুলতান  এভাবে হয়ে ওঠেন অন্য এক মাত্রার অন্য রকম। বাঙালির একান্ত নিজস্ব ঘরানার শিল্পী। সাহিত্যিক আহমদ ছফা এজন্য শিল্পী এস এম সুলতান  কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে  লিখেছেন: 
‘সুলতানের কৃষকেরা জীবন সাধনায় নিমগ্ন। তারা মাটিকে জাষ করে ফসল ফলায় না। পেশির শক্তি দিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গম করে প্রকৃতিকে ফলে –ফসলে সুন্দরী সন্তাসবতী হতে বাধ্য করে। এই খানে জীবনের সংগ্রাম এবং সাধনা. আকাঙ্খা এবং স্বপ্ন, আজ এবং আগামীকাল একটি বিন্দুতে এসে মিশে গিয়েছে। সৃলতানের কৃষকেরা নেহায়েত মাটির করুণা কাঙাল নয়। রামচন্দ্র যেমন অহল্যা পাষাণীকে স্পর্শ করে মানবী রূপ দান করেছিলেন, তেমনি তার মেহনতি মানুষদের পরশ লাগা মাত্রই ভেতর থেকে মাটির প্রান সুস্দর মধুর স্বপ্নে  ভাপিয়ে উঠতে থাকে। এ মানুষগুলো পাখা থাকলে দেবদূতের মতো  আকাশের অভিমুখে উড়াল দিতে পারতো। কিন্তু একটি বিশেষ ব্রতে,  একটি বিশেষ অঙ্গিকারে আবদ্ধ বলেই তারা মাটির দিকে ঝুঁকে পড়ে আছে। সে অঙ্গিকারটি, সে ব্রতটি মাটিকে গর্ভবতী ও ফসলশালিণী করা।  মাথ্র উপরে স্বর্গলোকের যা কিছু প্রতিশ্রুতি, যা ছিু প্রেরণা তার সবটুকু Ñ  আকাশে নীল থেকে, রামধণু বর্ণের সুষমা থেকে ছেঁকেএনে মাটির ভেতরে চারিয়ে দিয়ে যাচ্ছে এই মানুষ-মানুষীর দল।’  (বাংলার চিত্র ঐতিহ্য: সুলতানের সাধনা- আহমদ ছাফা, র ব -১, পৃ: ১৬৫)
এ অনন্য সাধারণ শিল্পী ও শিল্পীর সাধনাকে  অনুভব করতে হলে মহাত্মা আহমদ ছাফা’র আরো একটি মূল্যায়ন মনে রাখা জরুরী:
শেখ সুলতানের মধ্যে দ্য ভিঞ্চি, মিকেলেঞ্জেলো, রাফায়েল প্রমুখ শিল্পীর প্রকান্ড কল্পনা এবং কল্পনার বলিষ্ঠ চাপ এত গভীর এবং অনপনেয় যে মনে হবে এ চিত্রসমূহ, কোনোরকমের মধ্যবর্তিতার বালাই ছাড়া, সরাসরি রেনেসাঁস যুগের জেতনার বলয় থেকে ছিটকে  পড়ে এই উনিশ শ’ সাতাত্তর সালে বাংলাদেশের কৃষক সমাজে  এসে নতুন ভাবে জন্মগ্রহণ করেছে। এই ছবিগুলো আঁকার মত মানসিক স্থিতাবস্থা অর্জন করার জন্য শেখ সুলতানকে সব দিতে হয়েছে। পরিবারের মায়া, বংশধারার মধ্যদিয়ে নিজের অস্তিত্বকে প্রবাহিত করার স্বাভাবিক জৈবিক আকাঙ্খা ভেতর থেকে ছেটে দিয়ে, এই চিত্র সন্তান জন্ম দেয়ার একাগ্রপ্রায় কাপালিক সাধনায় নিযুক্ত থাকতে হয়েছে সারাজীবন। শেষ পর্যন্ত অসম্ভব সম্ভব হয়েছে। বাংলার শিল্পীর হাত দিয়ে বাংলার প্রকৃতি এবং  বাংলার ইতিহাসের একেবারে ভেতর থেকে রেনেসাঁস যুগের ফুল ফুটেছে। সুলতানের সাধনা মিথ্যা হয়ে যেতো ,  যদি না  বাংলার শিল্পীর সঙ্গে সহযোগিতা কনের  একটি যুদ্ধ বাধিয়ে দিয়ে  ইতিহাসের জাগ্রত দেবতা াপন স্বরূপে সামনে এস না দাঁড়াতেন।
এইখানে সুলতানের অনন্যতা। এই খানে বাংলার কোন শিল্পীর  সঙ্গে ভারতবর্ষের কোন  শিল্পীর সঙ্গে সুলতানের তুলনা চলে না। অবনীন্দ্রনাথ,যামিনী রায়, নন্দলাল, জয়নুল অবেদীন, আবদার রহমান চাঘতাই,নাদী, এ সকল দিকপলি শিল্পীর মধ্যে যতই পার্থক্য থাকুক, তবু সকলের মধ্যে অন্তর্নিহিত যোগসূত্র অবশ্যই রয়ে গেছে। হ্যাভেল ভারতীয়  শিল্পদর্শনের যে সংজ্ঞাটি দিয়েছেন, কেউ তার আওতা ছাড়িয়ে যেতে পারেননিÑ একমাত্র সুলতান ছাড়া। (বাংলার চিত্র ঐতিহ্য: সুলতানের সাধনা- আহমদ ছাফা, র ব -১, পৃ: ১৬৭)
শিল্পী এস এম সুলতানের  কোনো পূর্বসরি ছিলো না, নেই কোনো উত্তরসূরিও। কিন্তু ট্রেজেডি হচ্ছে তার কর্মময় জীবন ও চিত্রগুলোর নিয়ে আলোচনার  প্রয়াসও নেই আমাদের মাঝে।

ভাষাতাত্ত্বিক রবীন্দ্রনাথ

1463400756192বাংলাদেশে ভাষাতাত্ত্বিক রবীন্দ্রনাথ নিয়ে প্রথম একাডেমিক আলোচনা করেন ড.কাজী দীন মুহাম্মদ। এ নামে তাঁর এক দীর্ঘ প্রবন্ধে, ভাষাতত্ত্ব(১৯৭১) গ্রন্থে। সময় গড়িয়েছে অনেক, বাংলাদেশে রবীন্দ্র চর্চার ব্যাপ্তি ঘটেছে। সম্প্রতি তিনটি পরিশ্রমী কাজ হাতে পেলাম। দু’টি পিএইচডি গবেষণা, একটি রবীন্দ্র গ্রন্থনা- বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের।
আগরতলা ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের রবীন্দ্র অধ্যাপক ড. সিরাজুদ্দীন আমেদ এর বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৪সালে, কলকাতা থেকে। পরিমার্জত নবযুগ সংস্করণ ২০১৫, ঢাকা থেকে।
দ্বিতীয় টি মোহাম্মদ আজমের। বাংলা ভাষার উপনিবেশায়ন ও রবীন্দ্রনাথ (আদর্শ ২০১৪)।যদিও লেখক কৃতজ্ঞতাপত্রে জানিয়েছেন – থিসিসের শিরোনাম ছিল: উপনিবেশ আমলে লেখ্য-বাংলার রূপ ও রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষাচিন্তা। অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান এর তত্ত্বাবধানে, ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয় এর বাংলা বিভাগ থেকে করা গবেষণা বলে বইটির প্রতি আকর্ষণ বেশী ছিলো। রবীন্দ্রনাথ নিয়ে ড.আনিসুজ্জামানেরও দুটো মূল্যায়নধর্মী গ্রন্থ রয়েছে। তাঁর রবীন্দ্র মূল্যায়নে রবীন্দ্র ব্যাখ্যা- অসংগতি’র একটি চমৎকার সূত্রনির্ণয় পাঠককে আলোড়িত করেছিলো সে সময়ে। মোহাম্মদ আজমের গবেষণায় বাংলায় উপনিবেশায়ন, তার প্রক্রিয়া ও বাংলা ভাষা, বাংলা গদ্যে এর প্রভাব, এসময়ে রবীন্দ্রনাথের ভাষাচিন্তা,সূত্রায়ন ও প্রণালী পদ্ধতি, বাংলাভাষা ধারা ও রবীন্দ্রনাথ, বাংলা ভাষার প্রায়গিক দিকগুলোতে রবীন্দ্র চিন্তার উপযোগিতা নিয়ে পুরো প্রসংগটির উপর আলোচনা হয়েছে।
বইটি বর্ণনাবহুল তবে উপভোগ্য। ৫১২পৃষ্ঠার বিশাল বইটি পড়ার জন্য মানসিক প্রস্তুতি প্রয়োজন রয়েছে। এবং বিষয়িটও বিশিষ্ট পাঠকদের জন্য। বাংলা ভাষার স্বাতন্ত্র্যিক অনুধ্যানে এ প্রসংগটি আরো চর্চার প্রয়োজন রয়েছে। বাঙালির ভাষাপ্রীতির বুদ্ধিবিত্তিক আয়োজন চাই, আবেগের প্রাবল্য থেকে।
……………
ম উ জ
১৬.০৫.১৬

কবিতার নতুন পলি: সবুজের তপস্যা

  • মাঈন উদ্দিন জাহেদ

ঋগবেদের ঋষির মতো যে কবি তত্ত্বজ্ঞানি কিংবা ‘ঙাপ্পি’র ঘ্রাণ খুঁজে যে কবি জীবনসন্ধানী, বা নিমগ্ন নার্সিসাস না হয়েও নিজেকে ভাবতে পারনে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অবতার, তিনি- কবি সবুজ তাপস। এ সমন্বয় তাকে হৃদ্য করেছে। আপতঃ সবুজ তাপসকে আত্মমগ্ন নার্সিসাস মনে হয়। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ নিজ নামইে প্রকাশ করেছেন এটি। তাহলে কী কবি গ্রীক পুরাণ নিয়ে আবারও হাজির হলেন বঙ্গজ হয়ে। কারণ তিনি যখন উচ্চারণ করেন: 

‘আমি নার্সিসাস নই, নিমগ্ন ঋতিক

তখন প্রশ্ন জাগে এ নার্সিসাস উত্থানের পেছনে কী কোনো দর্শন আছে? আছে কী কবি ও কবিতাকে অভেদ্য বাঁক। আপাতঃ আমরা কবি ও কাব্যে তাই হতে দেখছি। 

সবুজ তাপস: প্রথম প্রকাশ ১৪২৯ মাঘ: ২০১৫ ফেব্রুয়ারি, রচনাকাল: ২০০১-২০১৪। কবতিা সংখ্যা: সত্তর। স্বত্ব: সবুজ তাপস। প্রচ্ছদ: নর্ঝির নৈঃশব্দ। অঙ্কন:তিলোত্তমা তিওলী ও গোঁসাই পাহলভী। প্রকাশক: প্রত্যালীঢ়, রাঁদভিু উঠান, আলো-১০১ রহমানি প্যালসে, আসকারাবাদ, চৌমুহনী, আগ্রাবাদ, চট্টগ্রাম: ৪০০০, বাংলাদেশ। মূল্য: ১৫০ টাকা।

কবিতার রাজ্যে সবুজ তাপস যে ধ্যানটি উপস্থাপন করেছেন, তা কাব্যগ্রন্থরে ফ্ল্যাপে, আশির অন্যতম কবি হাফজি রশদি খান উন্মোচন করেছেন। দৃষ্টান্তবাদী কবতিা। তুলনা-উপমা ও দৃষ্টান্তরে ফারাক কোথায়? কিংবা প্রায়োগিক র্পাথক্য কোথায় তা জানতে হয়তো তাদরে কাব্য আন্দোলনরে গদ্যযাত্রায় দেখতে হবে। কিছু তথ্য পাওয়া যায় ঢেউ, পঙ্খবাস, চেরাগিআড্ডা। কিন্তু পাঠকের সামনে থাকে শুধু কবিতা। যা কিছুই কবি উচ্চকণ্ঠে বলুক, চিরকাল কবির ভাষ্য হয়ে দাঁড়াতে হয় কবিতাকে। সবুজ তাপসের কবিতায় ‘সবুজ তাপস’ নাম দেয়া কাব্যগ্রন্থরে এ কৈফিয়ত কিছুটা বিপরীত ঠেকেছে কবি তাপস ও হাফজি রশদি খান এর বক্তব্যে। 
চার খণ্ডে বিভাজিত কবিতা ‘সবুজ তাপস’। কবি ক’ খণ্ডে বিভাজিত বিধাতা জানেন কিংবা জানেন তার পরম নিকটজন। আপতঃ আমরা দেখি–বিখণ্ড–ভূখণ্ড, বাঁচনভঙ্গি, সালফিউরিক আবেগ, পাতার গান। কবি এজাজ ইউসুফী ‘সবুজ তাপস’ এর ভূমিকায় উদ্ধার করতে চেয়েছেন কবি ও কাব্যকে। এ আন্তরকি প্রয়াস অনুজদের প্রেরণার হয়ে থাকবে।
সবুজ তার কবিতায় কাম-প্রেম-জীবনকে যাপন করে র্দাশনকিতায়। এ র্দশন আক্রান্ত নয়। জীবনের চলতি পথে সে জুনিপণ্ডিত। এক ধরনের তাচ্ছল্যি তার শৈলী। কথা-সংলাপ-প্রেম-কাম-তত্ত্ব সবকছিু তার তুড়ির ওপর চলে। যাপতি জীবনে শুনশান মধ্যবত্তি নয় সে। সে কবি, যন্ত্রণাকে অভ্যস্থ করে শব্দরে তুড়ি বাজিয়ে কবিতার র্স্বণরেখা এঁকে যেতে চায়। অসামান্য হয়ে তার সমস্ত মুদ্রা চিন্হিত হয়ে যায় তার ‘সামান্য’ শিরোনামের কবিতাটি।

র্গব নাই, র্গবপাতও
তবু সামান্য শেকলে গাঁথা!

তোমার সামনে দাঁড়ানো আমি, আংরাখা

তোমার ভেতরে ছিলাম শঙ্খের শাখা…

যখন তুমি

আগ্রাবাদ হতে চৌমুহনী যাও,

আমি পদ্মা হতে মেঘনায়

মাছের সাথে মিশে যাই ! 

এখন আর

নন্দন কানন হবার

ইচ্ছা নাই ! 

( সামান্য: সবুজ তাপস: পৃষ্ঠা: ২৩) 

কবিতাটি খুব ছোট, ভাব আরও ছোট কন্তিু সবুজের মুদ্রা উঠপ এসেছে এক এক করে। ব্যক্তি কবির অহংকার নেই, না থাকাটাই মহত্তের লক্ষণ; কিন্তু একেবারেই কী নেই? না থাকলে কী তিনি কবি হতে পারতেন? এক ধরনের অহম ব্যক্তি চারিত্রে আছে বলেই তিনি অন্য কিছু না হয়ে কবি। র্নাসিসস মিথস্কিয়া না থাকলে কী সৃজনশীল মানুষ হওয়া যায়? না তার মাঝে এর উত্তরণরে মহৎ অভিপ্রায় আছে বলে তিনি অহংকে অবহলো করেছেন। কিন্তু র্গবপাত? সবুজ এ লৈংগিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে চান? না, তাহলে ঋতুর্পনের মতো কি হরমন গ্রহণ করতেন? না, তাহলে? এখানে তার প্রধান চারিত্রটি পষ্ট হয়ে ওঠে: তাচ্ছিল্য ।
কথ্য ঢঙে, কথার ফুলঝুরিতে তাপস আত্মস্ত করছেে এ তাচ্ছল্যি। জীবনে, যাপনে, কামে, প্রেম, দ্রোহে সব কিছুতে তার মধ্যবত্তি শুনশান নৈতিকতা নেই। পাঠক জানে, সে পুরুষ, তাও সে বলেছে র্গবপাত নেই। এ অপ্রয়োজন কথনে ধরা পড়ে তার স্বভাব-স্বদভাব। ‘তবু সামান্য শেকলে গাঁথা’ কীসে? এসব শব্দকারগিররা জীবনে যেমন শৃঙ্খলাহীন তার ও শেকলে গাঁথা? হ্যাঁ, বোধের অধকি বোধের মাঝে যাপন করে বলে কাব্যরে শিল্পীরা হৃদয়গ্রন্থনাকে উন্মোচন করেন কারণে অকারণে। সামান্য তিলের জন্য শমরখন্দ ও বোখারাও বিলিয়ে দিতে পারেন। তাই চিরকাল কবি-শিল্পীরা জীবনে দারদ্রিকে যাপন করেছেন হৃদয়রে উষ্ণতায়। তাচ্ছল্যিরে বরাভয়ে অস্তিত্বের কবি- আংরাখার অবয়বে, কিন্তু ভাবের কবি মিশে গেছেন পদ্মা- মেঘনা-যমুনার জলে। এখানে যাপনের বাস্তবতা ও মননের বাস্তবতার ব্যাপ্তি ও পরিধি চিন্হিত হয়েছে রুঢ় বাস্তবতা ও কবির বাস্তবতার সংশ্লেষে। তবে এ কবিতায়, ‘মাছের সাথে মিশে যাই’ এ পংক্তির প্রয়োজন ছিলো না। ‘আমি পদ্মা হতে মেঘনায়’ এর মাঝে উপলব্দরি সমস্ততা পাঠককে পৌঁছে দেয় কবির ভাবসত্যে।

‘এখন আর / নন্দন কানন হবার/ ইচ্ছা নাই।’ পংক্তির মাঝে গীতকিবতিার মতো পেলবতা নেই সত্য কিন্তু রুক্ষ বাস্তবতাকে উপস্থাপনরে কামারিক তারুণ্য আছে।এমন জ্বলজলে সত্য উচ্চারণরে মাঝে একবিংশতাব্দির শূন্য দশকে অন্যতম কবি সবুজ তাপস হয়ে ওঠে জুনিপণ্ডিত। তার কবতিায় অনেক প্রসঙ্গই আছে। তবে আছে এক ছফার মতো এক ধরনের ক্ষেপাটে সাহস, সুলতানরে মতো এক ধরনরে নিজস্বতা, বোদলেয়রের মতো এক ধরনরে ক্লেদকুসুম র্চচার প্রবণতা। তার বাঁশির প্রতি মুগ্ধতা, জীবনের জঙ্গম যাত্রায় শিল্পকে ছেঁকে নেয়ার মন, চৈতন্যে এক ধরনের বাউলি প্রজ্ঞা ফুটে ওঠে কবিতার পংক্তিতে পংক্তিতে।
আধুনিক মানুষ হিসেবে সাহিত্য-সমাজ-রাজনীতি-র্অথনীতি সব ছুঁয়েও কবি যখন শব্দের ভাব ও সুরে শিল্পের সুষমা নির্মানে প্রত্যয়ি হান, তখন নিরাশ না হয়ে পারে না। জগৎময় যেন এক নৈরাজ্যের ঘরকন্যা। একজন র্হাদ্য মানুষ হিসেবে চারদিক র্স্বাথের দ্বন্দ্বে, এমন কী এর প্রভাব আচমতি করেছে শিল্প-সাহত্যিকেও যখন। মানবিকতার সবচেয়ে নির্মম র্পযায় অতক্রিম করছে এ সময় যখন। কেউ কারো ভালো সহ্য করতে পারছে না।    
সবুজও দোটানায় পড়ে যায়:

তিনচোখে যখনই দেখি
জৈবনকি জটিলতা, তড়পাই রাগে

ভাল্লাগে না ভবের হাটরে বেচাকেনা

আত্মহত্যা করবার ইচ্ছা জাগে! ( দোটানা: ) 

এছাড়া নাগরিক জটিলতা, ফ্রয়েডিয়ো বাসনা, কবিতযশ, আত্মকাম, ইতিহাসের অনুসঙ্গ মিলিয়ে সবুজ তাপস সালফিউরিক আবেগে, কিছু কিছু ধাতব পদ্যে কিছু শরীরঘন পংক্ততিে পাঠক ঠোঁটে উষ্ণতা এনে দেয়। কিছু শুকনো পাতাও আছে পদ্যবাগানরে ডালে। র্স্বাথপরের মতো বলতে হয়: তথাস্ত… তথাস্তু… কবির না হোক, কবতিার জয় হোক। 

সত্তরটি কবিতায় সবুজ ছুঁয়েছে বাঙালির ইতিহাস, ঐতহ্যি, রাজনীতি,র্ধম, সাধনা, আধুনকি মানুষরে দ্বন্দ্ব, কাম, প্রেম র্সবােপরি জীবনকে। যে জীবনকে সে যাপন করে মননে, তার প্রতিরূপ হয়ে কবিতায় উঠে এসেছে গৌরবে:

 কেন সংবিধানে বাজছে ‘বিসমিল্লার’র সানাই

 কেন অভিধানে ‘শেখ মুজিব’ এর র্অথ বাংলাদশে নাই;

পাঠক কবিতার পংক্তিতে পংক্তিতে নতুন উপলব্দি ও স্বাতান্ত্রকি মনোচিন্হের ভাব দেখতে পাবেন তার কাব্যদৃষ্টিতে। কবিসুলভ কল্পনা ও উপমিত স্বভাবরে সাথে তার র্দশনগত ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পষ্ট হয় তার শৈল্পিক পংক্তিগুলোতে। সবুজ তাপস পড়ে অন্তত কেউ প্রতারতি হবনে না অনুভূতরি সততায়, উপলব্ধির গাঢ়তায়, চৈতন্যরে সৃজনশীল বেদনায়। তাই তো দুঃসাহসী উচ্চারণ:
আমার কোনো লিঙ্গ নাই, কেবল মৃত্যুহীন
লতিয়ে যাই। (বায়োডাটা) 

এমনি নতুন ভাবভাষ্যে সবুজ তাপস বাংলা কবিতায় এনেছেন নতুন পলি।এ ধারায় আগাম পৃথিবীতে রচিত হবে নব শষ্য- বাংলা কবতিার, আধুনকি উত্তরাধুনকি কাব্যযাত্রার। শুভ হোক সবুজের যাত্রা, শুভ হোক তাপসের তপস্যা। 
……………………………

২৮.০২.১৬

মাঈন উদ্দিন জাহেদ এর একগুচ্ছ কবিতা

মাঈন উদ্দিন জাহেদ এর একগুচ্ছ কবিতা

image

আল মাহমুদ
………………..

রবিবাবুকে অতিক্রমনের ইচ্ছে ছিলো অন্তত: বয়সে;
তিনি অতিক্রম করে গেলেন;
সফেদ চুল ও দাড়ির সাথে ভ্রু যুগলও শাদা হয়ে গেছে-
তবু লিখে যান সাহসের সমাচার।
কথকতা ও কবিতার আড়ালে নাদিরার চুলগুলো এলোমেলো উড়ে,
অতিক্রমনের নেশায় সাজান যিনি অদেখা ভুবনের তশতরী।
ধূপের আড়াল নয়, নয় লোবানের ঘ্রাণ-
কবিতায় ভাসান তিনি আাত্মার তুলতুলে কারুময় গালিচা;
এমন এক অনাঘ্রাণ জীবনের অমৃত সাজিয়ে বসে আছেন শব্দের সুরম্য রাজপ্রাসাদে…
গল্পের দিন শেষ, এখন গালগল্পের পালা
পালাবদল দেখে দেখে গেয়ে যান তুমি কার শালা?
……………
০৪.০৫.২০১৬

চাপাতি
…………

নিত্যদিন আক্রান্ত ভয়ের সংস্কৃতিতে
নিত্যদিন ব্যস্ত নিজেকে নিয়ে।
সেলফিতে সেলফিময় আমাদের মুখশ্রী
শ্রী নেয় শুধু মনোচৈতন্যে।
ভয় আমাদের জামা, ভয় আমাদের পাজামা
ভয় আমাদের নেংটি, ভয়ে ভয়ময় আমি-তুমি।
কি হবে ভেবে ভেবে?
যখন মুণ্ডুই থাকবে না চাপাতির কোপে।
………..
২৬.০৪.২০১৬

তোমার বাঁশী বাজুক!!
…………………………….
হে ক্ষমতা! তুমি অবিনশ্বর হও;
তবু আমাদের রেহায় দাও-
চাপাতির কোপ, বুলেট ও ব্যালেটের ধূম্রজাল থেকে।
গুপ্তহত্যা, গুম, চোখ উপড়িয়ে ক্রসফায়ার থেকে।
আমার ট্যাক্সের টাকায় কেনা বুলেট যখন আমাকে বিধে
হে ক্ষমতা! তখন আমার বলার থাকে না কিছুই;
বেঁচে থাকার আর্তনাদ ছাড়া আর কোনো দাবী নেই।
ভোটাধীকার আমি চাই না;
দণ্ডমুন্ডের খোয়াব উবে গেছে বহু আগে;
আমি নির্বীয নপুংসক হয়েগেছি সিটি কর্পোরেশন কল্যানে;
জন্মনিয়ন্ত্রণ বিভাগের কর্মীরা বহু আগেই আমাকে কিছু টাকা গুজে দিয়ে ইন্জেকশন পুশ করেছে ;
আমি বহু আগেই স্বপ্নকে বেচেছি মুড়ি মুড়কি দামে।
এখন শুধু আমি বাঁচতে চাই;
খোকা ঘুমিয়েছে, পাড়া জুড়িয়েছে,
বর্গী আসলে আসুক;
আমার প্রানটা না গেলেই হয়-
হে ক্ষমতা! তোমার বাঁশী বাজুক! তোমার বাঁশী বাজুক!!
…………
২৭.০৪.২০১৬

বিষ্টি
……..

রাতগুলো যুবতী হলে আমাদের সুখদ পুরুষ নিদ্রাহীনতায় ভোগে ;
বালখিল্যের সন্ধ্যা গড়িয়ে গড়িয়ে রাঙা মেঘকে ডাকে চুম্বনের তৃষায়;
মেঘবালিকা আজন্ম চতুর জোনাকি – ফড়িং এর সাথে সদভাব পূর্বজন্মের।
কেবল ঘুরে ঘুরে স্বপ্ন জাগায় বালক আকাশে,
ও মেঘ বিষ্টি হয়ে আসো! বৈশাখী ঝড়ে আমি তোমাকে আলিঙ্গনে জড়াবো।
আমি বিষ্টির কাছে জীবনের হিসেব চুকাবো।
…………………..
২৩ এপ্রিল ‘১৬
১১.৫৪

তাসবি
………..
স্বপ্নাদ্র মাদুলি পরে তাসবি গুনি তোমার,
ধ্যানের পরিক্রমে ছুঁতে ছুঁতেই সরে যাচ্ছো তুমি,
তাসবি গুনছি আর ঘুরছি, ধ্যানেই তাওয়াফ;
ধ্যানেই তোমাকে ছুঁতে চাওয়া
চারদিকে প্রবল বাঁধা, লাজওয়াব।
কাঠের দানাগুলো ঘুরতে থাকে
হয়ে যায় মাঝে মাঝে অদৃশ;
কোন এক যাদু বাস্তবতায় এক একটি নক্ষত্র হয়ে
আমাকে ঘুরাতে থাকে কস্ মো বাস্তবে ;
চারদিক মায়া ঝিম, চারদিক জিকির জিকির।
এ কোন কা’বা?
শুধু সিজদারত গ্রহ-নক্ষত্র আর অন্য সব আলোর পিদিম;
মায়া বাস্তব, ছায়া বাস্তব, তুমি বাস্তবে সবায় !
অলৌকিক মায়া মন্ত্রে শুধু জিকির শুনি আমার সিনায়।
………………..
৩১.০৩.২০১৬

নীরবতা
………….
তুমি কি জীবনটা শাদাকালো-
তুমি কি আজীবন ডাগর ডাগর
চোখে, দেখেগেলে আমার ভালো-
ভাষায় কোনো কিছু না বলে
শুধু দিয়ে দিয়ে দিয়ে গেলে;
জীবনটাতে নীরবতায়
হৃদয়বাদ্য বেজে গেলে।
গান গেয়ে যাও গুণগুণিয়ে
সব যন্ত্রণা সয়ে গিয়ে
বোঝা কী কমাও মনে-প্রানে ?
নীরবে মান ভুলে গিয়ে?
হে নীরবতা! কে বোঝে তোমার ভার?
গভীরতা! রাত কী বোজে তোমার কারবার?
………………….
১৭.০৩.২০১৬

সময়ের রুদ্র নায়ক
……………………….
সুসময়ের বিপ্লবীদের উৎপাত বেড়েছে,
জেগে থাকো মহাকাল।
যমুনার কালো জলে ফোরাতের ছায়া।
হায় কারবালা!
বিপ্লব লিখবে ত্যাগের ইতিহাস-
যে আনবে সুন্দরের অবিমিশ্র অনাবিল ভোর।
আমি তার গান শুনতে চাই! তোমার গিটারে।
জাগো সময়ের রুদ্র নায়ক, জাগো!
…………………
২১.০৪.২০১৬

প্রতি কবিতা
……………….
নিজের দ্রোহের ইতিহাসকে কেউ কেউ অস্বীকার করে আজকাল বিপ্লবী হয়ে যায়;
হোমোর আশির্বাদে এশিয়া কবিতা উৎসবে কবিতা পড়ে নিজেদের কবি ভেবে যায়;
নিজের মতই চুড়ান্ত সত্য ভেবে যারা আত্মপ্রসাদে ভুগে
সত্যের কাছাকাছি নয় বরং নিজেকে ক্রমান্নয়ে করে তোলে তারা স্বৈরভূত;
যাপনের পথে বোধকে আবিষ্কার করতে করতে যারা সমবেত সবার কথা ভেবে লাগাম টেনে ছিলো যাপনে,
তারাতো অন্তত: বিবেকের কাছে সৎ থেকেছে হে মহাকাল!
শিল্পের আড়ালে যারা ছদ্মবেশী লম্পট ছিলো তাদের চেয়ে।
তবে কেনো এতো তুলসী তলার নৃত্য?
আশির দশক বাল ছিঁড়েছে কাব্যে,
বোধের কাছে লিখা আছে সব-
ইতিহাস নিয়ে যখন কেউ লিখবে,
প্রতিবিপ্লবীরা তখন খুউব চটবে কিংবা চাটবে।
…………………
২০.০৪.২০১৬

কুশল
……….
কেমন আছো শুভ্রা !
তোমার শুভ্র আভায় ভরে উঠতো আমাদের জেগে ওঠা ভোরের দৃশ্যগুচ্ছ;
সম্ভাষণের স্নিগ্ধতায় ছড়িয়ে দিতে রাঙা পরীর ডানা;
যে ডানার আলপনার কারুর মোহে কেটে যেতো আমাদের পুরুষ পৃথিবীর মধ্যদুপুর।
সন্ধ্যা হতে হতে তোমার কিছুটা ঘ্রাণ রয়ে যেতো আমাদের প্রানের তসতরিতে।
মুগ্ধতার পংক্তি গুলো কতদিন শুনতে পাই না!
আহা! তুমি এলে!
রাতগুলো হয়তো আর কাঁদবে না-
তোমার গড়াগড়ির মুদ্রাগুলো তার ভাঁজ করে রাখার কষ্টে।
তোমার পংক্তির ভাঁজে শিউলির ঘ্রাণে আবার প্রাণিত হবো,
এসো প্রিয়ভাষী, এসো প্রানোষ্ঠ বোশেখে।
……………….
৭এপ্রিল’১৬

ভেদ
…….
যখন জলজ সত্য ন্যায় সত্য জীবন সত্য এক
তোমার কাছে আমি সত্য-তুমি সত্য বাড়ছে শুধু ক্ষেদ-
করে কি না করে চলছি শুধু সময় কে উদ্ যাপন;
মহাকালের দণ্ড ভোগে না পাই যেনো ভেদ।
……………….
৪ এপ্রিল’১৬

নিখিলেশ! কেমন আছো?

Y 2014 (1052)

নিখিলেশ! কেমন আছো? মনে পড়ে সব কিছু।

সবুজে আড্ডা- বাঙলা একাডেমীর বটমূল
বকুলতলা-দর্শন চত্বর কিংবা রমনার ঘনঘাসে পায়ে পায়ে হাটা।
মনে পড়ে মলচত্বর- হাকিম চত্বর কিংবা ফুলাররোড ধরে হেঁটে চলা।
আমাদের নীলিমা সঙ্গ-প্রসঙ্গ হলেই জুড়ে দেয়‘নিখিলেশপ্যারিসে-মইদুল ঢাকাতে…’
আমি শুধু বোবা হয়ে থাকি।
আমার নির্লিপ্ত চোখ ওদের ভাবায়`ও বেটা এমন নির্মোহ থাকে কীভাবে?
ওরা কী জানে ক্ষরণের যন্ত্রণা?
আমার দেখা না দেখার কষ্টগুলো পঁই পঁই করে কীভাবে লতিয়ে উঠছে স্মৃতিতে ?
কেমন আছো শিউলীতলা?
লালসুরকীর চাতালে কত শিশির জমা হয়েছে তোমার?
কত দিন সরদার ফজলুল করিমের ক্লাস করার মজাই পাইনা-
নিজেকে সক্রেটিস কিংবা প্লেটো ভাববার বোধ
ক’জন তৈরী করে দিতে পারে?
যারা পারে- তাদের পাই না?
কেমন আছো শিমুল? তোমার রক্তজবা হাসি
ক’জন সামলে নিতে পারে দুরন্ত যৌবনে!
বটগাছের ঝুল ধরে কতনাদোল খেয়েছি-
ইচ্ছে হোতো দোল হোক জীবনেও।
বটতলা স্বাক্ষী- স্বাক্ষী দাদু কিংবা ফুলতোলা শিউলীতল।
আমি এখনও খুঁজি আমাদের বকুল সন্ধ্যা-রিমঝিম দুপুর
কিংবা কুয়াশা সকাল।
মনে পড়ে গোলাপ! মনে পড়ে সব কিছু?
রিক্সার হুট ফেলে দুরন্ত বাতাস খাওয়া?

মুঠোয় মুঠোয় মুদ্রার শ্রাদ্ধ করে কতদূর আনন্দে লুঠেছি আনমনে।
এখন সময় গিলে খাচ্ছে আমাদের।
সময়কে ধারণ করে প্রতিদিন ইতিহাসও গিলে খাচ্ছে আমাদের।
একটি অন্তরগত ক্ষরণ নিয়ে আমাদের পথ চলা।
বিন্দু বিন্দু বোধ-নির্বোধ করে দিয়ে
আমাদের নিয়ে যাচ্ছে অনৈতিহাসেরগহ্বরে…
কেমন আছো সময়? কেমন আছো রাঙা বিকেল?
সব কিছু সন্ধ্যার দিকে যায়? যায় না।
যায় না বলে আমরা সবাই পথ করে নেই পথে পথে…
ঝিঁঝিঁ মাখা পথ আমাদেরও তাড়িত করে স্মৃতির চাতালে
অনৈতিহাসের গহ্বরে…।

সেপ্টেম্বর সিরিজ: মাঈন উদ্দিন জাহেদ

sm-sultan-09

 সেপ্টেম্বর ছুঁয়েছে যাকে

সেপ্টেম্বর ছুঁয়েছে যাকে হৃদয় ছিঁড়েছে তার,
গীন্সবার্গ হেঁটে যায় হৃদয়ের পথে;
কুয়াকাটায় সূর্য ওঠে,সূর্য ডুবে মনে
জীবনের আছে বুঝি নানা রূপ মানে।
শিমূলেরা গান গায় কার্তিক সন্ধ্যায়,
সেপ্টেম্বর ছুঁয়ে যায়, ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় ;
গীন্সবার্গ হেঁটে হেঁটে স্বপ্নের ভিড়ে-
পায়ে পায়ে ছড়ায় জীবন;
জীবনের নানা রঙ, রঙ বেরঙ মন।

 সেপ্টেম্বরের মেঘরৌদ্র
সেপ্টেম্বরের আকাশ মেঘলা হলে
তাকে কাদ্ম্বরী ডাকলে মন্দ হয়না
তবে যে দ্বন্দ্ব হয়;
রবীন্দ্রনাথ তেড়ে আসতে পারন।
তাঁর গোপন চিঠি ফাঁস করে দেবো বলে
কবিতার ক্লাস থেকে বের করে দেন।
গদ্যের বারান্দায় বড়বেশি বেমানান হবো;
তাই তোমাকে ইরা ডাকবো।
তোমাকে নিরাও ডাক তে পারি-
ব্যঞ্জনবর্ণের চমৎকার সমন্বয় এতে;
কিন্তু ঐযে সুনীল নিরা নিরা বলে চিৎকার করে-
ওতো পুরনোপ্রেম-পঞ্চাশের নায়িকা;
তোমাকে তাই ইরা ডাকা।
তুমিতো কবিতা স্বপ্ন মগ্ন স্বপ্নীল চাওয়া-
সারগামের চ মৎকার আবৃত্তি হওয়া।
ইরা!স্বর-ব্যঞ্জনেরপ্রেম-স্বপ্নীল হওয়া
এবং তুমি সেপ্টেম্বরের মেঘরৌদ্র
এবং তুমি ইরা ইরা ইরা

সেপ্টেম্বরঃ আগুনের বোন তুমি, ফাগুনের বোন

সেপ্টেম্বর আসে যায় সেপ্টেম্বরতো আগুন
এই সেপ্টেম্বরেই দেখেছি তোমার ফাগুন…
তুমিতো আগুন নও তুমিতো ফাগুন
জয় শ্রী …
জয় গুণ …
তোমার ছুয়েঁচছি আমি অহংকার বাদামী;
তোমার ছোঁবনা আমি যাপনের ভাঁড়ামী;
পাশকাটি পাশফিরি- পাশবিক উল্লাসে;
রাত যায় জেগে জেগে-বোধের বিন্যাসে।
জয় শ্রী…
জয় গুণ…
তোমাকে সেলাম কুটুম…।
জয় গুণ…
জয় ফাগুন…
বোধ আর ক্রোধ আমার তোমার মাঝে বসত গড়েছে
নিয়ত জ্বলে ওঠে তুষের আগুন;
সেপ্টেম্বর আসে যায় সেপ্টেম্বরতো আগুন।

সেপ্টেম্বর মানে বাউল হয়ে যাওয়া

ফাগুন এলে তাকে অন্য রকম সেপ্টেম্বর মনে হয়
রোদগুলো গুছানো মেঘের মতো কিশোরীর ফ্রক হয়ে খেলা করে,
চৈতন্য জুড়ে শুধু পাখা ঝাপটায় শাদা শাদা বক;
মিঠেলা রোদ আর ঝিলের জলে স্নান সারে সেপ্টেম্বর।

সেপ্টেম্বর মানে ভেতরে ভেতরে আউল-বাউল হয়ে যাওয়া,
সেপ্টেম্বর মানে উপরে সুনসান গুছানো ফুলবাবু;
সেপ্টেম্বর মানে মিঠেলা রোদের হাসি ঝিলের জলে পাখিদের স্নান
কিংবা ইউক্যালিপ্টাস শিশির থেকে তোমার ঘ্রাণ নেওয়া
এবং ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাওয়া… ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাওয়া…
সেপ্টেম্বর মানে ফাগুন লাগা অন্য রকম বাউল হয়ে যাওয়া।

সেপ্টেম্বরের ইলশে রোদ ঘিয়ে বিষ্টি
এবং হলুদ রৌদ্রের পালানো দেখে থেমে গেলে
ঘিয়ে রোদ ইলশে বিশটির সাথে চুপচাপ ঝুপঝাপ;
তরুণী ভিজছে সিঁড়িতে এবং একজন ভিতরে…
সেপ্টেম্বরের ইউক্যালিপ্টাস ভিজছে
ফতুয়া ভাঁজ করছে একজন;
আড়চোখে ইউক্যালিপ্টাস দেখছে;
শিশির কুড়াচ্ছে একজন
এবং তরুণী ভিজছে…
মুখটিপে হাসছে ইউক্যালিপ্টাস, তরুণী কিংবা বিষ্টি।

আশলে সেপ্টেম্বরের রৌদ্র পালাচ্ছে বিষ্টি হচ্ছে
আশলে সেপ্টেম্বরের বিষ্টি হচ্ছে ইউক্যালিপ্টাস ভিজছে
আশলে ফতুয়া-উড়ণীর ভাঁজের আড়ালে কাঁপছে প্রাণ
এবং তুমুলভাবে ভিজতে ভিজতে হয়ে ওঠে
ইলশে রোদ ঘিয়ে বিষ্টি’র ঝুপঝাপ-চুপচাপ পটভূমি।